জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। তিনি জানান, সরকার যখন জনগণকে দমনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সৈনিকদের জন্য নিজ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো সহজ ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনাপ্রধানের ডাকা দরবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেখানে বাহিনীর ভেতর থেকে বার্তা এসেছিল যে জনগণের ওপর নির্বিচার গুলি চালানোর নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হবে না।
ফজলে এলাহী আকবর জানান, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে ফোন করেন। পরদিন ১০টায় সেনাপ্রধানের বাসভবনে দেখা হলে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেন: তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না, নিজে ক্ষমতা নিতে চান না এবং চলমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজছেন। সেনাপ্রধান তাঁকে প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনার জন্য প্রস্তুত করতে বলেন। এরপর তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না ও জোনায়েদ সাকিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
৫ আগস্ট দুপুরে সেনা সদরে আলোচনার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ডাকা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর সেনাপ্রধান জানান যে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর তিনি অন্তর্বর্তী একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চান। পরবর্তীতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ওই সময় রাষ্ট্রপতির সামনে তিনি তিনটি প্রস্তাব রেখেছিলেন: পুলিশের অতিমাত্রায় দমন-পীড়নে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করা যাতে অভিযুক্তরা পালাতে না পারেন এবং গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ থেকে বন্দীদের মুক্ত করা।
তিনি আরও জানান, জুলাই আন্দোলনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেনাবাহিনীর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৭৫ সালের পর আমরা সেনাবাহিনীর ভেতরে বারবার অস্থিরতা, অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান দেখেছি। ৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে যাতে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। আপনারা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেখেননি, আমি দেখেছি। তিনি উল্লেখ করেন, ওই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে চলে যেতে দেওয়াই ছিল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত, যা বড় ধরনের রক্তপাত এড়াতে সাহায্য করেছে। ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার পালাবদল, পাল্টা অভ্যুত্থান ও সিপাহিদের প্রতিক্রিয়া আমি কাছ থেকে দেখেছি। পরিশেষে তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রধান শর্ত হচ্ছে আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা।

















