বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত ঢেলে সাজাতে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের (এফএসএসপি-২)’ আওতায় এই ঋণ দেবে সংস্থাটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার হবে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কার কার্যক্রমের সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিসভাকক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন। এই প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতের মোট ১৫টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেকে তোলা হবে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টটি একনেক তালিকায় রাখা হয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে। তিনি আরও বলেন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, সম্পদে অসুলভতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্বল প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসহ উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিবন্ধকতা নিরসনই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ২৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, আর সরকারি অর্থায়ন মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।
দেশের আর্থিক খাতে উচ্চ মাত্রার নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), সুশাসনের অভাব, পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থা, তারল্য ও মূলধন সংকট (বিশেষ করে সরকারি ও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে), ঋণাত্মক মূলধন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মতো সমস্যাগুলো বিদ্যমান। এসব কারণে জিডিপির গতি মন্থর হচ্ছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সাইবার আক্রমণ এবং ক্রস-বর্ডার আর্থিক ঝুঁকির মতো উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ আমানতকারীর আস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা মোকাবিলা করতেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ডিআইটিএফের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নতি ঘটানো হবে। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।
যদিও প্রকল্পের কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি রয়েছে। মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে যাচ্ছে। শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেজ তৈরিতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীতে আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা আছে, যা মূলধন খাতে মোট ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে।
প্রশিক্ষণেও উল্লেখযোগ্য অর্থ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, যার জন্য ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বরাদ্দ। এর মধ্যে আইডিএর অর্থায়ন ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অংশ ৩ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগে মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সেবার জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারে দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে নতুন গাড়ি কেনার সুযোগ নেই; প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নেওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পের ব্যবহারযোগ্য কিছু যন্ত্রপাতি নতুন কর্মসূচিতে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, তবে অচল বা ব্যবহারের অনুপযোগী সামগ্রী নেওয়া যাবে না।

















