নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিতে সদ্য যোগদানকারীদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে বেশি হবে। তবে চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের কারণে ইতিমধ্যে চাকরিতে থাকা ব্যক্তিদের বেতন বৃদ্ধির হিসাব ভিন্ন হবে। বর্তমানে সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডের মধ্যে নবম গ্রেডে (বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির চাকরি) মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে নতুন কাঠামোয় ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে। কিছু পদে যোগদানের সময় অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টও দেওয়া হয়।
সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, সন্তানের জন্য শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং টিএ বা ডিএসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পান। নতুন কাঠামোয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ফোনের ভাতাও যুক্ত হয়েছে, যা গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
গতকাল সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মূল বেতন, ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হবে এবং গত জুলাই থেকে কার্যকর হবে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ বাতিল হয়ে যাবে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই থেকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং জুলাই থেকে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। বাড়িভাড়াসহ নতুন সব ভাতা চতুর্থ ধাপে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে যুক্ত হবে, তবে এই সময়ে আগের ভাতা বহাল থাকবে।
স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের কথা বিবেচনা করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব গ্রেডের জন্য প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হবে। তাঁরাও সব ভাতা পাবেন চতুর্থ ধাপে।
উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের জুলাইয়ে নবম গ্রেডে যোগদানকারী একজন নতুন চাকরিজীবীর পুরোনো কাঠামোয় মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে তা বেড়ে হবে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হলে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা আগের কাঠামো অনুযায়ী পাবেন। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতা কার্যকর হলে ঢাকায় কর্মরত নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার ৪৪ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া (২২ হাজার টাকা) এবং অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়ে মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে। এই গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি সম্প্রতি দশম গ্রেড করা হয়েছে। চাকরির শুরুতে এই গ্রেডের পুরোনো মূল বেতন ছিল ১৬ হাজার টাকা, যা নতুন কাঠামোয় শুরুতে ৩২ হাজার টাকা হবে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বাড়লে মূল বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ধাপে ৪ হাজার টাকা যোগ হয়ে ২৮ হাজার এবং তৃতীয় ধাপে আরও ৪ হাজার টাকা যোগ হলে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩২ হাজার টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে বর্ধিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হলে এই গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তা বা প্রধান শিক্ষকের শুরুতে মোট বেতন-ভাতা ৫০ হাজার টাকার বেশি হবে।
তবে নতুন চাকরিজীবীদের তুলনায় পুরোনোদের ক্ষেত্রে হিসাবটি ভিন্ন, কারণ তাঁদের বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধার ওপর মোট বেতন নির্ভর করবে। এক যুগের বেশি সময় ধরে চাকরি করা ঢাকার একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, বর্তমানে তাঁর মূল বেতন ২২ হাজার ৪৫০ টাকা এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা পান। নতুন বেতনকাঠামোয় সবকিছু মিলিয়ে তাঁর মোট বেতন ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি হতে পারে বলে তিনি আনুমানিক হিসাব করেছেন। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে হিসাবটি স্পষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদটি ১৩তম গ্রেডের। এ গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু হতো, যা নতুন কাঠামোয় শুরু হবে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে। সময়ের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে এই মূল বেতন সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ২০২৮ সাল থেকে নতুন একজন সহকারী শিক্ষকের মোট বেতন-ভাতা ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি হবে।
১৭ বছর চাকরি করা নোয়াখালীর একজন সহকারী শিক্ষক জানান, পুরোনো কাঠামোয় ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে তাঁর মূল বেতন এখন ২০ হাজার ৮০০ টাকা এবং তিনি ভাতাসহ প্রায় ৩৩ হাজার টাকা পান। নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথম ধাপে তাঁর মূল বেতন দাঁড়াবে ২৭ হাজার ৩০০ টাকার কাছাকাছি। সব ধাপ বাস্তবায়িত হলে তাঁর মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৫০ হাজার টাকা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামো–সংক্রান্ত আদেশ অর্থ বিভাগ থেকে আগামীকাল বা পরশু জারি করা হবে, তখন সব বিষয় স্পষ্টভাবে জানা যাবে।

















