ঢাকার নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক বাসভবন আহসান মঞ্জিল বর্তমানে একটি জাদুঘর হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই জাদুঘরের ৯ নম্বর গ্যালারিতে রাখা আছে নবাবদের ব্যবহৃত পাঁচটি লোহার সিন্দুক। একসময় এগুলো নবাব পরিবারের কেন্দ্রীয় ভল্ট বা ব্যক্তিগত কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে পাঁচটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটি এখনো খোলা হয়নি, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। পুরান ঢাকায় এই সিন্দুকগুলো নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে।
আহসান মঞ্জিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা। জাদুঘরের উপকিপার দিবাকর সিকদার জানিয়েছেন, তালাবদ্ধ সিন্দুকগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে। তিনি নিজেও মাঝে মাঝে জানতে চান যে সিন্দুকের ভেতরে আসলে কী আছে, কিন্তু সেই সুযোগ তাঁর নেই।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঢাকার নবাব পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩০ সালে ফরাসিদের কাছ থেকে একটি কুঠিবাড়ি কিনে তা সংস্কার করে বাসভবনে পরিণত করেন। তাঁর ছেলে আবদুল গনি সেখানে আধুনিক নকশায় একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে তাঁর ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ১৮৫৯ সালে এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৮৭২ সালে শেষ হয়। ১৯৫২ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় ঢাকা নওয়াব এস্টেট অধিগ্রহণ করা হলে নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ পরিবারসহ আহসান মঞ্জিল ছেড়ে পরীবাগে চলে যান। ১৯৮৫ সালে সরকার আহসান মঞ্জিল অধিগ্রহণ করে সংস্কারের পর ১৯৯২ সাল থেকে এটি জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে আসে।
পাঁচটি সিন্দুক কবে আহসান মঞ্জিলে আনা হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে জাদুঘর কর্মকর্তাদের ধারণা, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার নবাব পরিবারে প্রচুর ধনসম্পদ ছিল এবং সেই সময়ে টাকা ও মূল্যবান অলংকার সংরক্ষণের জন্য সিন্দুকগুলো লন্ডন থেকে আনা হয়েছিল। সিন্দুকগুলোতে খোদাই করা তথ্য এবং জাদুঘরের নিবন্ধন খাতা অনুযায়ী, এগুলো যুক্তরাজ্যের ‘চাব্স’ (Chubb’s) নামক কোম্পানি তৈরি করেছে। কলকাতার এজেন্ট ‘দ্য থমসন অ্যান্ড কোং’–এর মাধ্যমে এগুলো আহসান মঞ্জিলে আনা হয়। চাব্স ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি এবং তারা নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরিতে সুপরিচিত।
শত বছরের বেশি পুরোনো হলেও সিন্দুকগুলোতে এখনো মরিচা পড়েনি। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিন্দুকগুলোর তালাব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। সবচেয়ে বড় সিন্দুকটির উচ্চতা ২৫৪ সেন্টিমিটার এবং চওড়া ১৪৮ সেন্টিমিটার, যেখানে ৯৪টি লকার বা দেরাজ রয়েছে। বাকি চারটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটির আকার একই—উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার ও চওড়া ৬৫ সেন্টিমিটার। অন্য সিন্দুকটি কিছুটা বড়, যার উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার এবং চওড়া ৯৯ সেন্টিমিটার। জাদুঘরে দেখা যায়, বড় সিন্দুকটি একটি আলমারির সমান, আর অন্যগুলো তার চেয়ে ছোট, প্রায় জুতা রাখার সেলফের আকারের।
আহসান মঞ্জিলে থাকা মালামালের তালিকা তৈরির জন্য ১৯৮৭ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটিতে ভূমি প্রশাসন বোর্ডের শাখাপ্রধান, ঢাকা বিভাগের সহকারী কমিশনার, ঢাকা নওয়াব কোর্ট অব ওয়ার্ডসের চিফ ম্যানেজার এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৯৮৭ সালের মে মাসে আহসান মঞ্জিলের তোশাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষ নামে পরিচিত একটি বন্ধ কক্ষে পড়ে থাকা মালামালের তালিকা তৈরি করা হয়। জাদুঘরের নথিতে উল্লেখ আছে যে, একটি বন্ধ কক্ষের লোহার দরজা ও দেয়াল তুলে বন্ধ করা জানালা ভেদ করে লোহার গরাদ দেওয়া প্রবেশপথ দিয়ে ১৯৮৭ সালের ১৮ মে ভেতরে প্রবেশ করে সিন্দুকগুলো পাওয়া যায়।
সিন্দুক পাওয়া গেলেও সেগুলোর চাবি পাওয়া যায়নি। সরকার গঠিত কমিটি তখন একটি সিন্দুকের দরজা কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে দেখা যায়, সিন্দুকের ভেতরে ৯৪টি লকার বা দেরাজ রয়েছে। জাদুঘরের নথি অনুযায়ী, কমিটি প্রথমে ৯৪ নম্বর লকারটি কাটে, কিন্তু ভেতরে কিছু পায়নি। সেদিন কাজ বন্ধ রেখে কক্ষ ও সিন্দুকটি সিলগালা করে দেওয়া হয় এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গ্যাস কাটার দিয়ে আরও লকার খুললে সিন্দুকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায়, ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের স্বার্থে যন্ত্রের বদলে দক্ষ মিস্ত্রির সাহায্যে দেরাজ খোলার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়।
প্রথম লকার খোলার পর সিন্দুকটি নিয়ে ১৯৮৭ সালের ১৯ মে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকা নবাববাড়ীর আহসান মঞ্জিলের তোশাখানা ভাঙ্গিয়া সরকারী লোকজন প্রায় একশত দেরাজের বিশাল লৌহ সিন্দুকের সন্ধান পাইয়াছেন।’ দৈনিক ইনকিলাবের শিরোনাম ছিল ‘যে রতনের সন্ধানে’। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘সাত রাজার ধন মানিক একটি রতন, সে রতনের সন্ধানে অবশেষে ঢাকার নবাব বাড়ীর সেই ঐতিহাসিক সিন্দুকটি খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দু’জন গ্যাস ওয়েল্ডার মিস্ত্রীর কয়েক ঘণ্টা অবিরাম পরিশ্রমের পর গতকাল সিন্দুকের মাত্র একটি দরজা কাটা হয়েছে। তবে এই অর্ধাংশের মধ্যে ইনার কেবিনেটগুলো খোলা সম্ভব হয়নি বিধায় সেখান থেকে কিছুই উদ্ধার করা যায়নি।’
ইনকিলাবের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নবাব হাবিবুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর সিন্দুকটি খোলা হয়নি। তখন সিন্দুকের ভেতরে সোনা, হীরা বা মূল্যবান সম্পদ থাকতে পারে—এমন নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে এবং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আহসান মঞ্জিল দেখতে আসতে শুরু করে।
১৯৮৭ সালে আহসান মঞ্জিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত আবদুস সাত্তার মিয়া জানান, যেদিন সিন্দুক কাটা হয়, সেদিন প্রচুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল এবং সাধারণ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘বের হয়ে স্যারেরা বলেছেন, ভেতরে কিছু নাই।’ তবে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাইরে গেলেই মানুষ বলাবলি করত, সেখানে নাকি অনেক স্বর্ণ ও হীরা পাওয়া গেছে। আমাদের কাছে জানতে চাইত।’
সিন্দুকের ভেতরে কী আছে তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল ও আলোচনা বাড়তে থাকায় ১৯৮৭ সালের ২৪ মে সরকার ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্যকে এই কমিটির সভাপতি করা হয়। কমিটি ১৯৮৭ সালের ২৫ ও ২৭ মে এবং ১ ও ২ জুন সিন্দুক খোলার কাজ করে। প্রথমে চাবি তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, ৮৫ নম্বর লকারটি ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করে দেখা হয়, কিন্তু সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি। এতে সিন্দুকের সামনের অংশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর কমিটি পেছন দিক থেকে লকারগুলো খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। শিকল ও বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পেছনের লোহার পাত ও কাঠামো খুলে ভেতরের অংশ পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, প্রতিটি লকারই খালি। এই অভিজ্ঞতার পর অন্য সিন্দুকগুলো খোলার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সিন্দুকটি মেরামত করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। সিন্দুকগুলো অত্যন্ত ভারী হওয়ায় কক্ষ থেকে বাইরে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে সিন্দুকটি মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ১৯৮৭ সালের ২৮ নভেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় প্রতীকী মূল্যে সিন্দুকগুলো বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে হস্তান্তর করে। বড় সিন্দুকটির দাম ধরা হয় ২৭ হাজার টাকা এবং মাঝারিগুলোর প্রতিটির ১০ হাজার টাকা। বাকি তিনটির দাম ৫০০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়। জাদুঘরের নথিতে উল্লেখ আছে যে, ১৯৯১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে একটি সিন্দুক খোলা হয়, কিন্তু সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি। বাকি তিনটি সিন্দুক এখনো খোলা হয়নি।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংকের একটি ভল্টও কখনো খোলা হয়নি, যা নবাব সলিমুল্লাহর সময়ের। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ ‘দরিয়া-ই-নূর’ নামের একটি হীরাসহ ১০৯টি রত্ন বন্ধক রেখে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। বর্তমান সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সেগুলো থাকার কথা থাকলেও, একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও সেই ভল্ট কখনো খোলা হয়নি। ফলে সেখানে হীরা আছে কিনা, তা কেউ জানে না।
বাকি তিনটি আর খোলা হয়নি।.মহড়াসহ সব প্রস্তুতি নেওয়া হলো, কিন্তু ‘দরিয়া–ই–নূর’ হীরার প্যাকেট খোলা হলো না.নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর ঢাকার নবাবদের বংশানুক্রমিক প্রথা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে খাজা হাবিবুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১০ জুন গদিতে অভিষিক্ত হন।
পরে অবৈধ দখলদার ও ভাসমান মানুষেরা সেখানে বাস করতেন।১৯৭৪ সালে প্রাসাদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সেটিকে নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

















