ঢাকার সাভারের সাধাপুর এলাকায় মসজিদের মাঠে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামে পাওয়া প্রেশার কুকার বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেছে পুলিশ। বুধবার (গতকাল) সকালে এই ঘটনা ঘটে। বিকট শব্দে ধোঁয়া ও ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি রাতে ড্রামটি মাঠে রেখে যায়। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক ইমরান হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেশার কুকারটি দেখতে পায়। পরে ঢাকা থেকে আসা বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট এটি নিষ্ক্রিয় করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ, যশোরে গ্রেনেড ও অস্ত্র উদ্ধার এবং সর্বশেষ সাভারের দুটি স্থানসহ মোট ১১টি ঘটনায় উগ্রপন্থী একই গোষ্ঠী জড়িত এবং তাদের বড় নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাভারের এই ঘটনার আগের রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি পাইপ বোমাসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে। তার আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মোহাম্মদ আরিফ নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ শ্যামপুরের ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আল কুরা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর অন্তত আটটি ঘটনায় নব্য জেএমবি সদস্যরা জড়িত বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কেরানীগঞ্জের ওই মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার হওয়া একটি মুঠোফোনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হাফিজ খালিদ ইব্রাহিমের ব্যক্তিগত গাড়িচালকের বাসায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। সেখান থেকে ১০টি শক্তিশালী গ্রেনেড, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ১৯টি গুলি, ১টি চাপাতি, ১টি ছুরি ও ১টি ক্ষুর উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলা, ৭ মার্চ কুমিল্লার একটি মন্দিরে বোমা হামলা, ১২ মার্চ ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা, ২৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে তল্লাশির সময় পাইপ বোমা বিস্ফোরণ, ২২ জুন উত্তরার দক্ষিণখানে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা, ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে বোমা উদ্ধার এবং ৩০ জুলাই আশুলিয়া এলাকার একটি মুদিদোকান থেকে প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনাও এই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সিটিটিসি ও অ্যান্টি–টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) কর্মকর্তারা বড় নাশকতার পরিকল্পনার খবর পেয়েছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২৪ জুলাই মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে বোমা রাখা হয়েছিল বলে তাঁদের ধারণা।
সাভারে গ্রেপ্তার আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে সাভারের আশুলিয়া এলাকার একটি মুদিদোকানে প্রেশার কুকার বোমাসহ একটি ব্যাগ ফেলে এসেছিলেন তাঁরা।
সিটিটিসির প্রধান ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হচ্ছে এবং পুলিশি নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত আছে। সর্বশেষ অভিযানটি তারই অংশ।
সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিন মিনিট হাঁটলেই আবদুল জলিলের তিনতলা বাড়ি। এই বাড়ির পেছনে একটি ফ্ল্যাটে গত ২ আগস্ট ভাড়া নিয়েছিলেন আব্বাস আলী নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ট্রাকচালক বলে পরিচয় দেন। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বাসা ভাড়া নিলেও তিনি পরিবার নিয়ে থাকবেন বলে জানান। ৫ আগস্ট তিনি কক্ষে সিলিং ফ্যান লাগান। মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত সিটিটিসি ও সাভার থানা–পুলিশ ওই বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায়। এর আগে হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ আরিফের তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, গ্রেপ্তারের সময় আরিফের কাছ থেকে একটি ব্যাগে পাঁচটি বোমা (জিআই পাইপের মধ্যে তৈরি), ছুরিসদৃশ্য তিনটি বোমা ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়।
জব্দ তালিকা অনুযায়ী, ওই কক্ষ থেকে ছয়টি বোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম—রাসায়নিক পদার্থ, বারুদ, গানপাউডার, ইলেকট্রিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড, প্লাস্টিকের কনটেইনার উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ঢাকার সাভার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে। মামলায় মোহাম্মদ আরিফ (২৬), নাজমুল হাসান মামুন (৩২), মো. আব্বাস আলী (৩০), কামাল হোসেন ডাক্তার (৪৫), বাপ্পী (৩০), রাকিবসহ (৩০) অজ্ঞাতপরিচয় আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য। তাঁরা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বিস্ফোরক দ্রব্যসহ সাভার এলাকায় জড়ো হন। আরিফ ছাড়া অন্য আসামিরা পলাতক।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ওই বাসায় আব্বাস আলী, আরিফ, নাজমুল হোসেন ওরফে মামুনসহ কয়েকজনের আসা–যাওয়া ছিল। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সিটিটিসির সূত্রমতে, সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার আরিফ নব্য জেএমবির সদস্য। ২০২৩ সালে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানায় তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তাঁকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তাঁর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলায়।
সিটিটিসির সূত্র বলছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তার শেখ আল আমিন, অলি উল্লাহ জনি; সাভারের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরিফ, পলাতক মামুন ও বাপ্পী—এদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে। মামুন ৯ বছর আগে জঙ্গিবাদের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ৫ আগস্টের পর জামিনে বের হন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় মো. উজায়ের হোসেন নামের এক যুবককে। এর আগে গ্রেপ্তার করা হয় শেখ আল আমিন ও তাঁর স্ত্রী আছিয়া বেগমকে। আছিয়া বেগম কেরানীগঞ্জের ওই মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন এবং বিস্ফোরণে আহত হয়েছিলেন। তাঁকেসহ বাচ্চাদের হাসপাতালে রেখে আল আমিন পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে গ্রেপ্তার হন। শেখ আল আমিন ২০১৭ সালে ও ২০২০ সালে দুই দফা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন উগ্রবাদী তৎপরতা–সংক্রান্ত মামলায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে আল-আমিন জামিনে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অলি উল্লাহ জনি ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, রূপগঞ্জ ও নরসিংদী থানার মামলায় গ্রেপ্তার হন। ২০২৩ সালে জামিনে মুক্ত হন।

















