রাজধানীর গুলিস্তান এলাকাটি যেন অপরাধীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বঙ্গভবন ও পুলিশ সদর দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কাছে থাকা সত্ত্বেও এলাকাটি বিশৃঙ্খলায় ভরা। চার বছর আগে গুলিস্তানে এক সাংবাদিক বন্ধুকে সতর্ক করার পরও তিনি নিজের মুঠোফোনটি পকেটমারদের হাতে হারান।
গত ৯ আগস্ট গুলিস্তানে গিয়ে সেখানকার স্কয়ার মোড় এলাকার জুতা বিক্রেতা সোলাইমান কবিরের কাছে জানতে চাওয়া হয়, গুলিস্তান কি বদলেছে? উত্তরে তিনি জানান, ‘না। আগের মতোই আছে। বাসের জানালা দিয়ে কখনো যাত্রীদের কানের দুল, কখনো ফোন টান দিয়ে নিয়ে চলে যায়। চোখের সামনেই দেখি। আর পকেটমারার ঘটনা তো প্রতিদিনই ঘটে।’
গুলিস্তানের অবস্থান রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনের মাত্র ২০০ মিটার এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬০০ মিটার দূরে। সচিবালয় ও সিটি করপোরেশনও হাঁটা দূরত্বে। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সান্নিধ্যে থেকেও এলাকাটি ছিনতাই, পকেটমারি, দিনদুপুরে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, প্রতারণা ও চোরাই পণ্যের কেনাবেচার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গুলিস্তান অপরিচ্ছন্ন এবং এখানে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১০ আগস্ট গুলিস্তানে এক ট্রাফিক পুলিশের বক্সে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তিনি খুব প্রয়োজন ছাড়া গুলিস্তান এলাকায় পকেট থেকে মুঠোফোন বের করেন না। এয়ারবাড ব্যবহার করে কথা বলেন, কারণ ছিনতাইকারীরা মুহূর্তেই ফোন কেড়ে নিতে পারে।
অথচ ‘গুলিস্তান’ শব্দের অর্থ ফুলের বাগান। ১৯৫৩ সালে রমনার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের উত্তরে ঢাকা জেলা ক্রীড়া মিলনায়তন এবং পল্টন মাঠের পাশে একটি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার নাম ছিল গুলিস্তান। চলচ্চিত্র বিষয়ক খ্যাতিমান সাংবাদিক অনুপম হায়াৎ লিখেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি ঢাকায় এসে এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন, যা ছিল ঢাকার প্রথম শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে চলচ্চিত্র ও শিল্প-সংস্কৃতির জন্য গুলিস্তান বিখ্যাত থাকলেও বর্তমানে এটি বিশৃঙ্খল ও অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
গত ৯, ১০ ও ১১ আগস্ট গুলিস্তানে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সেখানকার সব ফুটপাত এবং রাস্তার বড় অংশ হকারদের দখলে। হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয়। ঢাকা ট্রেড মার্কেটের উত্তর পাশে এক ব্যক্তি হকারদের কাছ থেকে ‘খাজনার টাকা’ হিসেবে দৈনিক ১০০ টাকা নিচ্ছিলেন। হকারদের তথ্যানুযায়ী, তার নাম জাহাঙ্গীর।
হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদার পরিমাণ দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা। বিপণিবিতান ঘেঁষে থাকা ফুটপাতে দোকান বসাতে মাসিক ‘ভাড়াও’ দিতে হয়, যা ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এক হকার বলেন, ‘আগে একদলের নেতারা খাইছে, এখন আরেক দলের নেতারা খাচ্ছে।’
২০১৯ সালে ইতালিয়ান সোসিওলজিক্যাল রিভিউতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, গুলিস্তানসহ ঢাকার পাঁচটি এলাকার হকারদের ৭০ শতাংশকে কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করতে হয়। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ৩৫ শতাংশ পুলিশ বা সিটি করপোরেশন এবং ১৪ শতাংশ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যবসা করেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজি হাতবদল হয়েছে।
ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর) দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজু, সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল বাসেত, ঢাকা ট্রেড সেন্টার (দক্ষিণ) দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মীর আল মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রানা, ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মনির হোসেন (টিটু), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, শাহবাগ থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মো. জসিম উদ্দিন প্রমুখের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মনির হোসেন স্বীকার করেন যে সেখানে চাঁদাবাজি হয়, তবে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন। ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান বলেন, ‘কিছু কর্মী হয়তো আমাদের নাম করে টাকা ওঠাতে পারে। পুলিশও এদের সঙ্গে জড়িত।’
সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট ও পোলট্রি পট্টি এলাকায় ফুটপাতের দোকান ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা তোলার সময় রসিদও দেওয়া হয়। রসিদে গুলিস্তানসহ ১৬টি স্থানে টোল আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে এবং ইজারাদারের নাম শেখ নিয়াজ মোর্শেদ, যিনি বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। নিয়াজ মোর্শেদ দাবি করেন, তিনি চাঁদাবাজি করেন না, বরং সিটি করপোরেশন থেকে কিছু এলাকার ইজারা নিয়েছেন। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন জানান, রসিদটি বৈধ নয় এবং এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগর প্লাজা, জাকের প্লাজা, কাপ্তান বাজার, নগর বিপণিবিতান, সিদ্দিকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বংশাল থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মামুন আহমেদ, বংশাল থানার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন, যুবদল নেতা রনজুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। মামুন আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াত এসব এলাকা দখল করে রেখেছিল, যা তারা উদ্ধার করেছে। ডালিম হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করেন।
গুলিস্তান এককভাবে কোনো থানার অধীনে নয়, এটি পল্টন, শাহবাগ এবং বংশাল থানার আওতাভুক্ত। শুধু গুলিস্তানে কত অপরাধ ঘটে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে যানবাহনের আশপাশে অপরাধীদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়, যারা সুযোগ পেলে মুঠোফোন, গয়না, ঘড়ি ইত্যাদি ছিনিয়ে নেয়। গত ১০ আগস্ট জিরো পয়েন্ট এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় এক ছিনতাইকারীকে ধরে মারধর করা হয়।
গত বছরের ৯ জানুয়ারি গুলিস্তানের একটি মসজিদে ইমামতির আড়ালে মাদক সিন্ডিকেট চালানোর দায়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৪ জুলাই রমনা ভবন মার্কেটের সামনের ফুটপাতে এক কর্মচারীকে অচেতন করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গুলিস্তানে প্রকাশ্যে তরুণ ও কিশোরদের মাদক গ্রহণ করতে দেখা যায়, এমনকি ট্রাফিক পুলিশের বক্সের সামনেও।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, অপরাধীরা জামিন পেয়ে আবার অপরাধ করে। তিনি আরও বলেন, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অপরাধের ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক একটি বিষয় রয়েছে। যদি সব পক্ষকে নিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা যায় এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো পরিবর্তন আসবে।
রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক গুলিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত এবং এটি বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসাকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে এখানে যেতে হয়। আদি ঢাকাবাসী ফোরামের সদস্যসচিব জাভেদ জাহান বলেন, বঙ্গভবন ও পুলিশ সদর দপ্তরে যাওয়া-আসার জন্য ভিন্ন পথ থাকলেও সাধারণ মানুষ গুলিস্তানে যায় এবং অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি মনে করেন, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ‘দেখেও না দেখার ভান’ করলে কোনো কিছুই ঠিক করা যায় না।
এখন এলাকাটি বিশৃঙ্খল ও অপরাধপ্রবণ বলেই পরিচিত।.‘বেচাবিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন ৩০০ টাকা দেওয়া লাগে’.চাঁদাবাজি পুরোনো, চাঁদাবাজ নতুনগুলিস্তানের অপরাধ বিষয়ে খোঁজ নিতে ৯, ১০ ও ১১ আগস্ট পরপর তিন দিন সেখানে গিয়েছি।

















