ঢাকার মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের মধ্যে দুই মা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসিন্দা তামান্না ইয়াসমিন জানান, তার ছেলে কিশোর মোহাম্মদ ওশান (১৬) স্কুল থেকে ফেরার পথে একবার সন্দেহজনক এক তরুণের অনুসরণ ও কাগজ চাওয়ার মুখে পড়ে। মাস তিনেক আগের এই ঘটনায় ওশানের মা ভয় পেয়েছিলেন, কারণ এর আগেই তার ছেলের দুই বন্ধু ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল। তামান্না বলেন, ‘খুব আতঙ্ক লাগে, কত আর চোখে চোখে রাখা যায়!’ সারা দেশে ‘কিশোর গ্যাং’ বা অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম্যে মা-বাবারা সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত। সন্তানের নিরাপত্তা এবং তারা বিপথে যায় কিনা, এই দুই দিক নিয়েই তাদের দুশ্চিন্তা। ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে নিজের বাসায় বসে তামান্না যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন পাশেই বসা ছিলেন এনায়েত উল্লাহ ও ওশান।
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার পর মায়েদের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পুলিশ বলছে, তার কাছে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এতে জড়িত ব্যক্তিরা তার পূর্বপরিচিত। অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ দুই কিশোর ‘আরজেড-৩৬’ নামক গ্যাংয়ের সদস্য ছিল বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সন্তান লালনপালন বা প্যারেন্টিং নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে আসে। মায়েদের আতঙ্ক আরও বেড়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার শিকার হওয়ার পর।
তামান্নার মতো উত্তরায় বসবাসকারী লাকি রহমানও তার সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি কর্মজীবী এবং তার ছেলে সাফওয়ান রহমান (১৩) মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। লাকি রহমান বলেন, পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা ও লাশ টুকরা করা এবং কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার সংবাদ দেখার পর তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরের অপরাধী চক্র নিয়ে আলোচনা বেশ পুরোনো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশি কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে সেখানে অপরাধ বেড়ে যায়। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মোহাম্মদপুরে অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয়, যার মধ্যে কিশোর গ্যাংও রয়েছে। ওশানের মা-বাবার মতে, এই পরিস্থিতিতে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে ও বিপথে যাওয়া ঠেকাতে তাদের বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশি কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে মোহাম্মদপুরে অপরাধ বেড়ে যায়।‘মোহাম্মদপুর কি ঢাকার “সিটি অব গড”’ শিরোনামে গত ১৯ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো।
তামান্না তার ছেলের মুঠোফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইসের পাসওয়ার্ড জানেন এবং মনে করেন আধুনিক যুগে সন্তানদের জন্য ডিভাইস জরুরি। ছেলে যেন ‘খারাপ সঙ্গ’ থেকে দূরে থাকে, সেজন্য তাকে স্কুলের আইটি ও সায়েন্স ক্লাবে যুক্ত করেছেন। ওশান সায়েন্স ক্লাবের নিউক্লিয়াস সাময়িকী প্রকাশের দায়িত্বে ছিল। তামান্না ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন যাতে সে সবকিছু বলতে পারে। ওশানের লেখা একটি প্রবন্ধে সে উল্লেখ করেছে, ‘অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রতিটি কাজকে অন্য কারও সঙ্গে মাপতে শুরু করেন… এই তুলনা সন্তানের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।’ ওশান তার মা-বাবাকে ‘অনেক সাপোর্টিভ’ বলে উল্লেখ করেছে। এ বছর সায়েন্স ক্লাবের নিউক্লিয়াস সাময়িকী প্রকাশের দায়িত্বে ছিল ওশান।.তামান্না ইয়াসমিন ও এনায়েত উল্লাহর আলিনা ইসলাম (৬) নামের আরেকটি সন্তান রয়েছে।
তামান্নার মতে, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে ওশানের মানসিক বিকাশ ভালো হয়েছে। গত বছর বইমেলায় ওশানের ইংরেজি কবিতার বই ‘পেট্যালস্ বিনেথ অ্যাশেস’ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের ঘরবন্দী জীবনের জন্য নিরাপত্তাহীনতা বড় অংশ দায়ী, যা তাদের জন্য জুলুম। তিনি মনে করেন, বাইরের নিরাপত্তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, কিশোর বয়সটা এমন যে সেখানে মা-বাবার বেশি নজরদারিকে তারা খবরদারি মনে করতে পারে। তাই কিশোরদের ব্যক্তিগত প্রতিটি ক্ষেত্রে নজরদারি না করে তাদের চাওয়াকে মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে। সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা সবকিছু খুলে বলে। একটি কিশোরেরও তো স্বাধীনতা রয়েছে, তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হতে দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’কিশোর বয়সটা এমন যে সেখানে মা-বাবার বেশি নজর রাখাকে তারা খবরদারি মনে করতে পারে—এমন মত তুলে ধরে শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, কিশোরকে তার ব৵ক্তিগত প্রতিটি ক্ষেত্রে নজরদারি না করে তারা যা করতে চায়, সেটাকে মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে।
লাকি রহমান তার ছেলে সাফওয়ানকে পাঁচ মাস আগে কারাতে ক্লাসে ভর্তি করেছেন যাতে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা করতে পারে। সাফওয়ান স্কুলের ডিবেট ক্লাব ও স্কাউটের সদস্য এবং প্রতিবছর ‘অলরাউন্ডার’ ও ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতেছে। তিনি ছেলের জন্য প্রতিদিন ৫০ টাকা বরাদ্দ রাখেন, যার মধ্যে ৩০ টাকা ভাড়া ও ২০ টাকা টিফিনের জন্য। যোগাযোগের জন্য বাসায় একটি বাটন ফোন রেখেছেন।
লাকি মনে করেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে কিশোর সন্তান বিপথে যাবে না। তবে সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, সপ্তাহে একদিন তারা একসঙ্গে সিনেমা দেখেন। একবার ছেলের এক বন্ধুর দেওয়া চিরকুটে প্রাপ্তবয়স্ক সিনেমার নাম লেখা ছিল। ছেলের সঙ্গে আস্থা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলে তিনি এই ঘটনা জানতে পারতেন না। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের এমনভাবে বড় করা উচিত, যাতে তারা তাদের সব কথা মা-বাবাকে এসে বলতে পারে। আমি ওকে (সাফওয়ান) বলিনি ওই বন্ধুর সঙ্গে আর মিশো না; বরং ভালো-মন্দ বুঝে চলতে বলেছি।’
লাকি রহমান বলেন, ‘আমরা বাচ্চাদের জন্য যতটুকু পারি করছি। সরকার ও সমাজের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা এই দায়িত্ব পালন না করলে আমরা (বাবা-মায়েরা) সন্তানদের পেছনে যে খাটুনি দিচ্ছি, তার সবই বৃথা হয়ে যাবে।’
উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে নয় বছর আগে সমবয়সীদের হাতে খুন হওয়া কিশোর আদনান কবিরের (১৪) ঘটনার পর কিশোর গ্যাং বিষয়টি আলোচনায় আসে। এসব দলে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের আধিক্য আছে এবং তারা মাদক, ছিনতাই, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। আদনান কবির হত্যার ঘটনায় জড়িতদের জামিনে বেরিয়ে আসার পর আদনানের পরিবার হুমকির মুখে উত্তরা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এখনো সেখানে অপরাধী দলের দৌরাত্ম্য রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ২৩৭টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার পর পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং কিশোর গ্যাংসহ অপরাধী দলের সদস্যদের ধরা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধ দমন জরুরি হলেও কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে নানা উদ্যোগ দরকার। শিশু বিকাশ ও অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ আঞ্জুমান পারভীন বলেন, সব মা-বাবা অর্থ ব্যয় করে সন্তানের জন্য ক্লাব বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে পারেন না। স্কুলগুলোর উচিত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশে কাজ করা। সরকারের উচিত এলাকাভিত্তিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা যেখানে সব শিশুর অংশগ্রহণ থাকবে এবং নিরাপত্তা থাকবে। লায়লা খন্দকার বলেন, শিশু-কিশোরদের বিকাশে মাঠ ও পার্ক রাখা এবং সেখানে নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের খেলাধুলা ও ঘোরার সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তবে অসুস্থতার কারণে ২০১৯ সালে তা ছেড়ে দেন।

















