ইরান, মানবজাতির সুপ্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির এক দেশ, যেখানে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং উত্থান-আধিপত্যের নানা গল্প বিদ্যমান। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম ধারক। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে এই অঞ্চলে বসতি ছিল এবং ৫৫৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শক্তিশালী পারস্য সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, যা আখামেনিদ সাম্রাজ্য নামে পরিচিত। পারস্য সভ্যতা তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, স্থাপত্য, ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। সময়ের পরিক্রমায় ইসলামি শাসন এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হলেও এর প্রাচীন ঐতিহ্য আজও অমলিন।
ইরান শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফার্সি শব্দ ‘এরাম’ থেকে, যার অর্থ ‘আর্যদের দেশ বা ভূমি’। এটি একটি প্রাচীন শব্দ যা এই অঞ্চলের আর্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বে ইরানকে ‘পার্সিয়া’ নামে উল্লেখ করা হতো, যা ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। আধুনিককালে ‘পার্সিয়ান’ শব্দটি সাধারণত সমস্ত ইরানি নাগরিকদের জন্য উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
পশ্চিম এশিয়ার ত্রিভুজাকৃতির এই দেশটি ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, পূর্বে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান, দক্ষিণে পারস্য ও ওমান উপসাগর এবং পশ্চিমে তুরস্ক ও ইরাক অবস্থিত। ইউরেশিয়ার কেন্দ্রে ও হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে ইরান ৩১টি প্রদেশে বিভক্ত এবং এটি বিশ্বের ১৭তম সর্বাধিক জনবহুল দেশ। ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও পৃথিবীর সপ্তদশ বৃহত্তম রাষ্ট্র।
বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ইরানের জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আদমশুমারির তথ্যমতে, দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৯১.৫ মিলিয়ন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতি হাজার জনসংখ্যায় জন্মহার ১৪.৩ জন এবং মৃত্যুহার ৫.৩ জন। ইরানিদের গড় আয়ু ৭৫.৬ বছর, যেখানে পুরুষের গড় আয়ু ৭৪.৩ এবং নারীর ৭৭.১ বছর।
ইরানের ইতিহাসকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাগৈতিহাসিক যুগ (প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১ লাখ বছর আগে থেকে প্রথম সহস্রাব্দের শুরু পর্যন্ত), প্রাথমিক যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমার্ধ) এবং রাজবংশীয় যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত)। রাজবংশীয় যুগে পারস্যের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে এবং ইরানের দৃশ্যমান উত্থান শুরু হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে তাম্র ও ব্রোঞ্জ যুগের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাসে ইরান বিভিন্ন পর্যায়ে বিবর্তিত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রথম পারস্য সাম্রাজ্যের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। এরপর সেলুসিড, পার্থিয়ান ও সাসানীয় সাম্রাজ্যসহ বিভিন্ন শক্তি ইরান শাসন করেছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাচীন যুগে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার সাথে ইরানের সম্পর্ক ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে মেডিস রাজবংশ ইরানকে একটি শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এরপর আসে আচেমেনিড সাম্রাজ্য, যা বিশ্বের প্রথম বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলোর অন্যতম ছিল।
আচেমেনিড সাম্রাজ্যের পর সেলুসিড, পার্থিয়ান ও সাসানীয় সাম্রাজ্য ইরানের সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও স্থাপত্যে ব্যাপক অবদান রাখে। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম আরবদের দ্বারা ইরান বিজিত হওয়ার পর ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে এবং এটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়, যা ইসলামি সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের বিকাশে সহায়ক হয়। ১৫০১ সালে সাফাভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ইরানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল, যেখানে শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। সাফাভিদের পর কাজর ও পাহলভি রাজবংশ ইরান শাসন করে এবং এই সময়কালে দেশটি আধুনিকীকরণের পথে অগ্রসর হয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ রেজা পাহলভির পতন ঘটে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও বিশ্বমঞ্চে পরিচিত।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের নীতিবাক্য হলো ‘স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র’। এর জাতীয় সংগীত ‘সোরুদে মেল্লিয়ে জমহুরিয়ে ইসলামিয়ে ইরান’। রাজধানী ও বৃহত্তম নগরী তেহরান। সরকারি ভাষা ফার্সি হলেও আর্মেনীয়, আজেরি, কুর্দি, বেলুচি, আরবি ও তুর্কমেনীয়সহ আরও অনেক ভাষা প্রচলিত রয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম শিয়া ইসলাম হলেও খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদিধর্ম ও জরথুস্ত্রবাদও পালিত হয়। সরকার এককেন্দ্রিক খোমেনিবাদী রাষ্ট্রপতিশাসিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ রেজা আরিফ।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জন্য ইরানের সরকারি বাজেট ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রস্তুত করা হয়, যা সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে প্রথম বাজেট। এর মোট ব্যয় আনুমানিক ২,৪৬২,০০০ বিলিয়ন টমান। বাজেটে প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম ৩৫ শতাংশ রাখা হয় এবং সম্প্রচারের জন্য বাজেট বরাদ্দ ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভ্যাট ও ব্যক্তিগত আয়কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি উপার্জনকারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং উচ্চ-আয়ের গোষ্ঠীর জন্য ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। সম্পদ, যানবাহনের মালিকানা ও আবাসনের ওপর অতিরিক্ত কর চালু করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
ইরানের অর্থনীতি মূলত মিশ্র ও পরিবর্তনশীল, যেখানে একটি বৃহৎ সরকারি খাত বিদ্যমান। দেশটির জিডিপি প্রায় ৪৩৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৫,৪১৫.২১ মার্কিন ডলার। তেল ও গ্যাস উৎপাদন ইরানের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জে ৪০টিরও বেশি শিল্পখাত অন্তর্ভুক্ত। ইরান খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে আপেল, গম, যব, কমলা, আখ, আলু, পোল্ট্রি ও সবজি রপ্তানি করে। গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর প্রতিবেদন অনুসারে, একবিংশ শতাব্দীতে ইরানের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা সমতানুযায়ী এটি বিশ্বের ১৮তম বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশ্বের ১০ শতাংশ তেল ও ১৫ শতাংশ গ্যাস সঞ্চয়সহ ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর হিসেবে গণ্য করা হয়। ইরানের প্রধান পেশা তেল ও গ্যাস শিল্প হলেও টেক্সটাইল, চিনি পরিশোধন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, লোহা, ইস্পাত ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য। ইরানের অর্থনীতির ৬০ ভাগই তেল ও গ্যাস উৎপাদন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ইরান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস মজুত ধারণ করে। তেল ও গ্যাস ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যালস, ফল, কার্পেট ও অন্যান্য হস্তশিল্পও রপ্তানি করে ইরান।
কারুশিল্পের ক্ষেত্রে ইরান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্পেটের তাঁতগুলো প্রতিটি এলাকার নিজস্ব নকশা ও মানের জন্য বিখ্যাত। হাতেবোনা কাপড়শিল্প আধুনিক টেক্সটাইল মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। খোরাসান তার ফিরোজা কাজের জন্য এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল তার প্রাকৃতিক মুক্তোর জন্য পরিচিত। ইসফাহান, শিরাজ ও তেহরানে কাঠের অসংখ্য সাজসজ্জার জিনিসপত্র উৎপাদিত হয়। তেহরানে মেশিনে তৈরি সিরামিক টাইলস তৈরি হয় এবং পাথর ও মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালির সরঞ্জাম, ট্রে, থালা ও ফুলদানি তৈরি করা হয়। মাশহাদ পাথরশিল্পের কেন্দ্র এবং হামাদান মৃৎশিল্পের বৃহত্তম কেন্দ্র।
স্থাপত্যের দিক থেকেও ইরানে গভীর ঐতিহ্য রয়েছে। এলামাইট, আচেমেনিয়ান, হেলেনিস্টিক ও অন্যান্য প্রাক-ইসলামি রাজবংশ তাদের মহত্ত্বের সাক্ষ্য রেখে গেছে। ইসলামি যুগে সেলজুক, ইল-খানিদ ও সাফাভিদ রাজবংশের স্থাপত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিশাপুর, ইসফাহান ও শিরাজের মতো শহরগুলো ইসলামি বিশ্বের মহান শহরগুলোর মধ্যে স্থান করে নেয়। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ইরানি স্থাপত্য কাউন্সিল পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণকে নিরুৎসাহিত করে ঐতিহ্যবাহী ইরানি শৈলীর ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। পাহলভি স্থাপত্য কর্মসূচির একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হলো ‘আজাদি বা স্বাধীনতা টাওয়ার’, যা পূর্বে শাহের স্মৃতিস্তম্ভ টাওয়ার নামে পরিচিত ছিল।
ইরানি সংস্কৃতি তার সাহিত্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। নবম শতাব্দীতে ফার্সি ভাষা তার বর্তমান রূপে আবির্ভূত হয়। ফেরদৌসি, নিজামি, হাফেজ, জামি ও রুমি-এর মতো মহান কবিরা আধুনিক ইরানি লেখকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ফার্সি সাহিত্য পশ্চিমা সাহিত্যিক ও দার্শনিক ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত হলেও এটি ইরানি সংস্কৃতির জন্য একটি প্রাণবন্ত মাধ্যম হিসেবে রয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর অনেক ইরানি লেখক নির্বাসনে গেলেও শাহরনৌশ পারসিপুর ও মনিরু রাভানিপুরের মতো লেখকদের দ্বারা নতুন সাহিত্যের জন্ম হয়েছে।
ইরানে জাদুঘরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তেহরানের গুলিস্তান প্রাসাদ জাদুঘর (১৮৯৪) এবং জোলফা (ইসফাহান)-এর সর্ব ত্রাণকর্তার ক্যাথেড্রাল জাদুঘর (১৯০৫) দুটি ব্যতিক্রম। তেহরান আধুনিক শিল্প জাদুঘর (১৯৭৭), ইরানের জাতীয় জাদুঘর (১৯৩৭), তেহরানের নেগারস্তান (১৯৭৫) ও শিরাজের পারস (১৯৩৮) অন্যান্য সুপরিচিত জাদুঘর। তেহরানে অবস্থিত প্রাচীন ইরানি সাংস্কৃতিক সমাজ, ইরানি গণিত সমিতি ও ইরানি মাইক্রোবায়োলজি সোসাইটির মতো জ্ঞানভিত্তিক সমাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
কুস্তি, ঘোড়দৌড় ও ধর্মীয় শরীরচর্চা ইরানের ঐতিহ্যবাহী খেলা। বিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে রাগবি, ফুটবল ও ভলিবলের মতো দলগত খেলাধুলা চালু হয়। ইরানি ক্রীড়াবিদরা ১৯৪৮ সালে প্রথম অলিম্পিক গেমসে অংশ নেন এবং ভারোত্তোলন, মার্শাল আর্ট ও কুস্তিতে পদক অর্জন করেন। ফুটবল ইরানে অত্যন্ত জনপ্রিয়, এবং দেশটির দল ১৯৬৮, ১৯৭৪ ও ১৯৭৬ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে। ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপে আত্মপ্রকাশ করলেও ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ইরানি খেলাধুলার জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।
দৈনিক সংবাদপত্র ও সাময়িকী তেহরানে প্রকাশিত হয়। ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামি নির্দেশনা মন্ত্রণালয় ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি পরিচালনা করে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সম্প্রচার মাধ্যম ও ইন্টারনেটের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ ব্যাপক। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও জার্নাল রাজনৈতিক সংস্কারের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘ইত্তিলাআত’ ও ‘কাইহান’ সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইরানের রেডিও-টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্রগুলো সরকার দ্বারা পরিচালিত এবং অনুষ্ঠানগুলো ফার্সি ও স্থানীয় ভাষায় সম্প্রচারিত হয়।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামরিক সক্ষমতায় ইরানের অবস্থান ১৪তম। প্রতিরক্ষা খাতে দেশটির বাজেট ৯৯৫ কোটি ডলার। নিয়মিত সেনা আছে ১১ লাখ ৮০ হাজার এবং রিজার্ভ সৈন্যসংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। মোট সামরিক বিমানের সংখ্যা ৫৫১টি, যার মধ্যে যুদ্ধ বিমান ১৮৬টি। ট্যাংকের সংখ্যা ১৯৯৬টি এবং সাঁজোয়া যানের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৬৫টি। রকেট আর্টিলারি এমএলআরএস-এর সংখ্যা ৭৭৫টি এবং সেল্ফ প্রপেলড আর্টিলারির সংখ্যা ৫৮০টি। ১০১টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ৭টি ফ্রিগেট এবং ১৯টি সাবমেরিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, ইরান ইউরেনিয়ামের মজুদ দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে।
ইরানের যুদ্ধ-বিপ্লবকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়: ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯) এবং ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮)। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ফলে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পশ্চিমা-সমর্থিত শাসনের অবসান ঘটে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিপ্লবের পেছনে পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা, সামাজিক অবিচার ও রাজনৈতিক নিপীড়নসহ বেশ কিছু কারণ ছিল। ১৯৮০ সালে ইরাক ইরানের ওপর আক্রমণ করলে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সূচনা হয়, যা ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সমাপ্ত হয় এবং ইরান উপসাগরের শাতিল আরব জলাধার লাভ করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ও অবরোধের মধ্যেও ইরান সামরিক, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক শক্তিতে নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বে ইরান শুধু অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখেনি, বরং আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি শক্তি হিজবুল্লাহ, হুতি, ইরাক ও সিরিয়ার শিয়াগোষ্ঠীর মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বিগত কয়েক দশকে বহুবার পশ্চিমা শক্তি ও ইসরায়েল ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং অভ্যন্তরীণভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নানা সংঘাত, সামরিক প্রতিরোধ, কূটনৈতিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ সংহতির মাধ্যমে ইরান নতুন এক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং পারস্য জাতিকে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম করেছে।

















