শান্তির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত সিলেটে এখন অপরাধের অন্ধকার নেমে এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সীমান্ত বাণিজ্য ও অপসংস্কৃতির প্রভাবে সুরমাপারের এই নগরে অপরাধের পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্বীন ব্রিজ, বন্দরবাজার ও আম্বরখানাসহ বিভিন্ন এলাকায় পথচারীরা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন। স্থানীয় সুবিধাবাদী নেতাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংগুলো এসব অপরাধের পেছনে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মহানগর এলাকায় ২৪টি হত্যা, ৪৪টি ধর্ষণ, ১৮৪টি চুরি, ৮টি ডাকাতি ও ৫৪টি ছিনতাইয়ের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি। অধিকাংশ আলোচিত ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গত দুই বছরে সিলেটে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনৈতিক কোন্দল, বালু-পাথর কোয়ারির আধিপত্য ও জমি দখল অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত গ্রাম ও মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি বছরের ৭ মে সোনাতলা গ্রাম থেকে ৪ বছর বয়সি শিশু ফাহিমার লাশ উদ্ধার এবং সম্প্রতি নগরীতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্য নিহতের ঘটনা সিলেটের অবনতিশীল পরিস্থিতির প্রমাণ দেয়। মার্চ মাসে আম্বরখানা ও জিন্দাবাজারে সশস্ত্র ছিনতাইয়ের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি হাউজিং এস্টেট এলাকায় দিনের আলোয় এক নারীর সর্বস্ব লুটের ঘটনায় জড়িতরা এখনো অধরা। ৫ মার্চ সাগরদীঘির পাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর পথরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনায় রশিদ নামের একজন গ্রেফতার হলেও বাকিরা ধরা পড়েনি। গত বছরের ২৬ অক্টোবর কদমতলীতে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১০ জন অংশ নিলেও মাত্র একজন গ্রেফতার হয়েছে।
বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইনের প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৯ জন গ্রেফতার হলেও মূল টাকা উদ্ধার হয়নি এবং অস্ত্রধারীরা এখনো পলাতক। এছাড়া ৪ এপ্রিল আম্বরখানায় এক সাংবাদিক ও তার শিশুপুত্রকে জিম্মি করে টাকা ছিনতাই এবং ১৩ মার্চ কুমারগাঁওয়ে ব্যবসায়ীকে লুটের ঘটনায় কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সূত্র জানায়, সিলেটে হানিট্র্যাপের ঘটনাও বেড়েছে, যার জের ধরে ২০২৪ সালের ১৮ জুন আম্বরখানায় এক ব্যক্তিকে ভবন থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অভাবের কারণেই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, বড় বড় অপরাধের তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তবে সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম দাবি করেন, অপরাধ দমনে পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে এবং মামলাগুলোর তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

















