গত ১১ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) একসঙ্গে পাঁচ শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন সামরিনা আক্তার। এর আগে গত ১৪ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয়েছিল এই শিশুদের মা-বাবার সঙ্গে। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাসিন্দা মোস্তাকিম হোসেন ও সামরিনা দম্পতির জীবনে সেই পাঁচ শিশুর আগমন ঘটার পর থেকেই শুরু হয় কঠিন লড়াই। স্বাভাবিক অবস্থায় ৩৯ সপ্তাহে শিশুর জন্ম হয়, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে তা ছিল ভিন্ন। পৃথিবীর আলো দেখার ১৯ দিনের মাথায় প্রথম শিশুটিকে এবং ৩২ দিনের মাথায় দ্বিতীয় শিশুটিকে হারাতে হলো তাদের। বর্তমানে বেঁচে থাকা বাকি তিন শিশুকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বাবা-মায়ের।
শিশুদের বাবা মোস্তাকিম হোসেন জানান, সন্তানদের চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা এখন রাজধানীর আজিমপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন। এখন পর্যন্ত দোকান বিক্রি ও ঋণ করে শিশুদের চিকিৎসায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন তারা। মোস্তাকিম প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেন, তবে তার নিয়মিত কোনো আয় নেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই সন্তানের জন্য দুই লাখ টাকা অর্থসহায়তা দিয়েছিল। তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ১২ দিন পর শিশুটিকে ঢামেকে নেওয়ার পর এনআইসিইউতে তাঁদের চারটি সন্তান ছিল। আরেকটি শিশুকে ২১ দিন পর বাসায় নিয়ে আসেন। এখন তিন শিশুর মধ্যে একটি অসুস্থ হওয়ায় তাদের শঙ্কা আরও বেড়েছে। তারা চান, বাকি তিন সন্তানকে হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা দিতে, কিন্তু টাকার অভাবে সেই ব্যবস্থাও করতে পারছেন না।
মা সামরিনা আক্তার জানান, জন্ম নেওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে তিনটি ছেলে ও দুটি মেয়ে ছিল। মারা যাওয়া দুটি শিশুর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তিনি আরও বলেন, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকেরা ৩০ থেকে ৩৫ সপ্তাহের মধ্যে সিজারিয়ান সেকশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ গর্ভাবস্থা অতিঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এনআইসিইউতে জায়গা সংকটের কারণে বিভিন্ন সময় শিশুদের বেসরকারি হাসপাতালে নিতে হয়েছে। ১ জুলাই একটি মেয়েশিশু এবং ১৩ জুলাই আরেকটি ছেলেশিশু মারা যায়। মারা যাওয়া ছেলেটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল এবং তাকে নল দিয়ে খাওয়ানো হতো। বাসায় আনার পরদিনই (৪ জুলাই) ছেলেটি অসুস্থ হয়ে গেলে তাঁরা ঢামেকে যান, হাসপাতাল থেকে নাকে নল লাগিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাসার আনার পরদিন ৫ জুলাই তাঁর সন্তান আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁরা আবার ঢামেকে যান, কিন্তু এনআইসিইউতে ১০টি শয্যা বা আসন ফাঁকা নেই বলে তাঁদের জানানো হয়। পরে তাঁরা সেই বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান, সেখানে বলা হয়—শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।
বিষয়টি নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, তাদের এনআইসিইউতে মাত্র ৩৮টি শয্যা রয়েছে এবং সেখানে শয্যা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া এই শিশুদের ওজন ছিল এক কেজির নিচে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে শিশুদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে মা সামরিনার বিশ্বাস, ঢামেকে উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো তার দুই সন্তানকে হারাতে হতো না। এখন বাকি তিন সন্তানকে বাঁচাতে তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য সহায়তার অপেক্ষায় আছেন।

















