দেশে গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে। গ্যাস সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাটও দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও কোথাও গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিএনজিচালিত যানবাহন চালকরাও চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অনেক চালক তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও মাত্র ২০-৫০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ গ্যাসের চাপ না থাকায় খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন চিত্র ঢাকার কয়েকটি সিএনজি স্টেশনে সরেজমিনে দেখা গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, সমস্যা সমাধানে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রে উত্তাল আবহাওয়ার কারণে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি, যেখানে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন চাহিদা ৫০০ কোটি ঘনফুটেরও বেশি। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে প্রায় ১৭৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে, আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনাল থেকে ৬০ কোটি ঘনফুটের স্থলে বর্তমানে মাত্র ২৮ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে কারিগরি ত্রুটির কারণে। অন্যদিকে, সামিট পরিচালিত টার্মিনাল থেকে ৫০ কোটি ঘনফুটের পরিবর্তে এখন মাত্র ২৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই দুটি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ৫৭ কোটি ঘনফুট কমে গেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সরকার গ্যাস সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সমুদ্র উত্তাল থাকায় সামিট টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যা হঠাৎ করে সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে অর্ধেক পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে এবং এটিকে পুরোপুরি সচল করতে হলে টানা তিনদিন বন্ধ রাখতে হবে, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি এই দুর্দশার জন্য দেশবাসীর কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন কেবল সাময়িক নয়, বরং দিনের পর দিন প্রয়োজনীয় সরবরাহ না থাকায় বহু কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কারখানায় শিফট কমানো হয়েছে অথবা কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গল ও বুধবার গাজীপুর ও নরসিংদী অঞ্চলে শতাধিক কারখানায় তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশও পূরণ করা সম্ভব হয়নি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ১৫ দিন ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, মাঝে মাত্র দুদিন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। গাজীপুরের একটি নিট কারখানায় যেখানে আগে প্রতিদিন ২৬ টন কাপড় উৎপাদন হতো, সেখানে গ্যাস সংকটের কারণে তা কমে সাড়ে ১১ থেকে ১২ টনে নেমে এসেছে, অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। কাপড় তৈরিতেও সময় বেশি লাগছে, যা আগে ১২ ঘণ্টা লাগত, এখন সেখানে ১৫-১৬ ঘণ্টা সময় লাগছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগ করছে। তিনি বলেন, শুধু গ্যাসস্বল্পতা নয়, বিদ্যুতের প্রকট সমস্যাও কারখানাগুলোকে জর্জরিত করছে।
শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমছে, কিন্তু শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণ, কারখানার স্থায়ী ব্যয় এবং জ্বালানি বিলের দায় থেকেই যাচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নরসিংদীর এক কারখানার মালিক মাসুদ মিয়া জানান, গত দুই মাসে গ্যাসের স্বল্প চাপে তার কারখানার উৎপাদন ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে এবং তিনি লোকসানে পড়েছেন। তার আশঙ্কা, আগামী মাস থেকে তিনি শ্রমিকদের বেতন ও গ্যাস বিল পরিশোধ করতে পারবেন না।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গত কয়েকদিন ধরে দিনে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। দেশের অন্যান্য শিল্প এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সর্বোচ্চ ৩,৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে এবং কোথাও কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্যাসের নিম্নচাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্প-কারখানাগুলোতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সূত্র জানিয়েছে, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের কয়েকটি জেলায় গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ করছেন। ভাঙচুর ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিদ্যুৎ অফিস ও স্থাপনা রক্ষায় নিরাপত্তা চেয়ে আরইবির কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা জানিয়েছেন, দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস আসছে না। রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলে তখনই তারা রান্নার কাজ সারেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর ১০টি সিএনজি স্টেশন ঘুরে ৭টি বন্ধ পাওয়া গেছে। চাপ না থাকায় স্টেশনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মীরা। মগবাজার রেললাইন সংলগ্ন একটি সিএনজি স্টেশনে মঙ্গলবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত সাড়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাপ না থাকায় গ্যাস না নিয়েই ফিরে যান এক গাড়িচালক। খোলা থাকা স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার পর অল্প পরিমাণে গ্যাস পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, গ্যাস সংকট কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। তিনি বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল, তার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে দুর্ঘটনা ও বৈরী আবহাওয়া। সাগর উত্তাল থাকায় সামিট টার্মিনালের কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না এবং এক্সিলারেট টার্মিনাল আংশিক সক্ষমতায় চলছে। পুরো সক্ষমতায় চালাতে হলে টার্মিনালটি আবার প্রায় ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হবে, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, মানুষের ভোগান্তি চরমে এবং এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে আমরা অসহায়। প্রকৃতি স্বাভাবিক হলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। বিগত সরকারগুলো মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না খুঁজে তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে যাওয়ায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা একসময় মোকাবিলা করতেই হতো।

















