মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমে যাওয়ায় বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছিল। তবে বর্তমানে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে মদিনা অঞ্চলের দক্ষিণে পাইপলাইন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। সৌদি সরকারের ভাষ্যমতে, ইরাকের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে, যাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
আবকাইক শিল্পনগরীকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা এই পাইপলাইনটি দিয়ে গত কয়েক মাসে দিনে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের ৪ থেকে ৫ শতাংশ। এটি বন্ধের কারণে বাজার থেকে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরে যাবে। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দুই পক্ষ নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়ায়। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় রিয়াদ এই পাইপলাইনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। হরমুজ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হতো, কিন্তু এখন দৈনিক চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ১০০ থেকে কমে ১৪টিতে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগরে হুতিদের তৎপরতা ও সৌদি পাইপলাইন বন্ধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড ৬ ডলার অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষক খালেদ বারতাফির মতে, এই পাইপলাইন বন্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ হবে।
হামলার দায় কোনো পক্ষ স্বীকার না করলেও রিয়াদ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইঙ্গিতে অভিযোগের তীর ইরানের দিকে। বাগদাদ পাল্টা হামলার পথ না বেছে সৌদি আরবের সুরক্ষায় সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভলফগ্যাং পুস্তাই মনে করেন, ইরান থেকে নির্দেশ পেয়েই ইরাকি গোষ্ঠীগুলো এই হামলা চালিয়েছে, যা সৌদি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে থাকা হুতিদের কৌশলগত সহায়তা দেয়। গত জুলাই মাস থেকেই সৌদি বন্দর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিরা বাধা সৃষ্টি করছে। সর্বশেষ শুক্রবার ইয়েমেন সরকার জানায়, হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ ও মোখা শহর দখল করে নিয়েছে।
এই উত্তেজনার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সামরিক সহায়তার জন্য ট্রাম্পের শরণাপন্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, মোখা শহরের কাছে হুতিদের অস্ত্র ও যানবাহন ধ্বংস করা হয়েছে। লোহিত সাগর ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার আগে ইয়েমেনে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিলেন। এই সংঘাতের ফলে নতুন করে ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, প্রায় ৫০০ জন বাব আল–মানদেব প্রণালি পেরিয়ে জিবুতিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ইয়েমেন ও জিবুতির দূরত্ব সাগরপথে ২৫ কিলোমিটার। জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস দাওয়ালেহ জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে ভাসমান নৌকায় নারী ও শিশুসহ অনেককে ওবক উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনিদের জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন।

















