ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী মোখা এবং পেরিম দ্বীপ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক তেলবাণিজ্যকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইরান-সমর্থিত এই শক্তিশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ পরিচালনা করেও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা বিশ্লেষকদের মতে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক পরাজয়ের একটি ধ্রুপদি উদাহরণ।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি এতদিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। গত বৃহস্পতিবার হুতিরা এটি দখল করে নেয়। পাশাপাশি তারা ময়উন নামে পরিচিত পেরিম দ্বীপটিও কবজা করেছে, যা বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত। এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। হুতিদের এই অগ্রাভিযানের জবাবে সৌদি আরব মোখা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের এই আধিপত্য ইরানকে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। গোষ্ঠীটি নব্বইয়ের দশকে আত্মপ্রকাশ করলেও ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালালেও তবে তারা শেষ পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ইয়েমেনে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।
গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিন ও হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে লোহিত সাগরে চলাচলকারী ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট জাহাজ নিশানা করে হামলা শুরু করে হুতিরা। গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। হুতিদের কাছে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোট রয়েছে, যা মার্কিন রণতরির জন্য হুমকি। ১৩ জুলাই তেহরান থেকে মাহান এয়ারের ফ্লাইটে আইআরজিসির সামরিক উপদেষ্টা ও সরঞ্জাম ইয়েমেনে পৌঁছানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। ইরান মূলত হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে লোহিত সাগরের নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।
২০২৫ সালের বসন্তে হুতিদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ অভিযানে প্রায় ৮০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় এবং এর খরচ হয় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। তবে এই বিপুল অর্থ ও আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। উল্টো হুতিরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ৬ মে ট্রাম্প ইসরায়েলকে অন্ধকারে রেখে হুতিদের সাথে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এই চুক্তিকে অনেকেই ‘আত্মা বিক্রির চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে সম্মত হয়েছে।

















