ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি ভারতের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সাজানো এখন জরুরি। ভারতের উন্নয়নের যাত্রায় ঢাকার অংশীদারিত্ব দীর্ঘদিনের, আর এই অংশীদারিত্ব অটুট রাখতে দিল্লির উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো। অভিন্ন নদী, রেলপথ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রতিবেশী দেশ হিসেবে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম।
ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে বর্তমানে এক ধরনের শীতলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে যে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তা এখনও ঝুলে আছে। এর পাশাপাশি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও তার কাছে আমন্ত্রণ রয়েছে। তবে এই সফরের জন্য ভারত কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য কঠোর কিছু শর্ত দিয়েছে। যার মধ্যে প্রধান হলো শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ, যাতে সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হয়। ভারত সরকার অবশ্য জোর দিয়ে বলেছে যে, হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পতনের পর থেকে হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে, যা ভারত প্রচলিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করছে বলে জানিয়েছে।
তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, তার মূল বিশ্বাস ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে, যা দিল্লি বা রাওয়ালপিন্ডি থেকে পরিচালিত নয়। তিনি মর্যাদা, সমতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান। অতীতের বিষয়গুলোকে বাধা মনে না করে তিনি গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্কের ওপর জোর দিচ্ছেন। চীন ও কথিত ‘চেকবুক কূটনীতি’র চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশই বাংলাদেশের সঙ্গে। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নেপাল, ভুটান ও বঙ্গোপসাগরকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি সংলাপের মাধ্যমেই বিদ্যমান মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের ভারত সফরই হতে পারে এই সম্পর্কের নতুন সূচনার বার্তাবাহক।

















