ভোরবেলা রাঙামাটি থেকে বাসে ঢাকায় আসার পর চিকিৎসক শামসুন্নাহার হেনা চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রিকশায় সদরঘাটের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু যাত্রাবাড়ী মোড়ের কাছে পৌঁছাতেই তিন ছিনতাইকারী তাঁর রিকশা থামিয়ে গলায় চাকু ধরে ফেলে। শামসুন্নাহার হেনা জানান, ছিনতাইকারীরা তাঁকে জীবন বাঁচানোর বিনিময়ে সর্বস্ব দিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। বাধ্য হয়ে তিনি ফোন ও লাগেজ তাদের হাতে তুলে দেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনার পর থানায় মামলা করে র্যাবের সহায়তায় তিনি কেবল মুঠোফোনটি উদ্ধার করতে পারলেও বাকি মালামাল আর পাননি।
যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় এলাকাটি বর্তমানে ঢাকার অন্যতম অনিরাপদ প্রবেশমুখ হিসেবে পরিচিত। গত ৯ থেকে ১৮ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, এখানে ছিনতাইকারীরা রীতিমতো ঘুরে বেড়ায় এবং সুযোগ পেলেই যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নেয়। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যাত্রাবাড়ী থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। থানায় এই সাত মাসে ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার মোট ১১৯টি মামলা হয়েছে এবং পুলিশ ১ হাজার ১৫১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘বেচাবিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন ৩০০ টাকা দেওয়া লাগে’—এমন চাঁদাবাজির শিকারও হতে হয় অনেককে।
যাত্রাবাড়ী শুধু একটি এলাকা নয়, এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কের প্রধান সংযোগস্থল। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, অর্থাৎ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের মানুষের সড়কপথে যাতায়াতের মূল পথ এখন ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়ক, যা শুরু হয় যাত্রাবাড়ী থেকে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এই জনপদে অপরাধের প্রবণতা এতই বেশি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এলাকাটি নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণায় বলা হয়েছে, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়ক অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভোর ও সন্ধ্যায় এখানে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় এই এলাকার ভয়াবহতা স্পষ্ট। গত ১২ আগস্ট রাজু শেখ নামের এক ব্যক্তি ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসার পথে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে যানজটে পড়ে ছিনতাইয়ের ঘটনার সাক্ষী হন। তিনি জানান, গাড়ির যন্ত্রাংশ খোলার সময় হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও ছিনতাইকারীর মধ্যে কোনো ভয় ছিল না, যা থেকে বোঝা যায় তাদের পেছনে আরও সহযোগী রয়েছে। একই দিনে সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানগামী এস আল আমিন নামের এক যাত্রী জানান, বাসের জানালা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ছিনতাইকারীরা বারবার তা খোলার চেষ্টা করছিল এবং অন্য এক যাত্রীর ফোন ছোঁ মেরে নিয়ে পালিয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ীতে বিগত ১৯ মাসে নিহত তিনজনের মধ্যে গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কাওসার হাওলাদার, ১৫ নভেম্বর অটোরিকশাচালক ইউসুফ এবং ২০ ডিসেম্বর কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদার রয়েছেন। ইউসুফের বাবা মো. খোকন জানান, ছেলেকে হারিয়ে তিনি বিচার নিয়ে সংশয়ে আছেন। সম্প্রতি এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়া এক যুবককে গণপিটুনি দিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু দাবি করেন, ছিনতাইকারীরা মূলত ভাসমান এবং পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, মামলার পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবে ছিনতাইয়ের ঘটনা আরও অনেক বেশি ঘটে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে আতঙ্ক তৈরি করছে।

















