পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার জেরে পরিকল্পিতভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে হত্যা এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বামীকে হত্যার পর স্ত্রী জেবুন্নাহার ও তার দুই মেয়েকে চোখ বেঁধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিবির ‘আয়নাঘরে’ ৪ মাস ৭ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় স্বামীকে জঙ্গি হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য জেবুন্নাহারের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই জঘন্যতম ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া অবশেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল এ মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় মেজর জাহিদ বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। পিলখানায় তার কোর্সমেট ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দার তাকে জানিয়েছিলেন যে, সেখানে বিডিআর পোশাক পরিহিত হিন্দিভাষী কিছু ব্যক্তি সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করছে। জাহিদ এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অনেক তথ্য জেনে ফেলায় তৎকালীন হাসিনা সরকারের টার্গেটে পরিণত হন। সেনাবাহিনীতে অযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে ২০১৫ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর পরিবার নিয়ে উত্তরায় এবং পরে রূপনগরে বাসা পরিবর্তন করলেও গোয়েন্দাদের নজরদারি অব্যাহত ছিল।
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল জাহিদকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর আগে ওই দিন রাত ১০টার দিকে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুকন্যাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। জেবুন্নাহারকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে জঙ্গি হওয়ার মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকেই জেবুন্নাহারকে জানানো হয় যে, তারাই মেজর জাহিদকে হত্যা করেছে।
গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জেবুন্নাহার এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। মামলায় একেএম শহীদুল হক ছাড়াও মো. মনিরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, মাসুদ আহমেদ, শাহীদ আলম ও কৃষ্ণ পদ রায়সহ তৎকালীন রূপনগর থানা পুলিশের অজ্ঞাত সদস্যদের আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল প্রধান আসামি শহীদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদের এই নির্দেশ প্রদান করেন।
ভুক্তভোগী জেবুন্নাহার ইসলাম জানান, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতন না হলে তাকে হয়তো জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো। জাহিদুল হকের ভাই জাহিদুল হক মজুমদার জানান, দীর্ঘ আড়াই বছর পর বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জাহিদের লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়, কারণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থাকলেও পরিবারকে তার লাশ দেওয়া হয়নি।
জেবুন্নাহার ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী শহীদ মেজর জাহিদুল ইসলামকে হত্যার পর আমার ওপর নেমে আসে অমানবিক, নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম নির্যাতন। আসামিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার স্বামীকে জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন না হলে হয়তো আমাকে ধুঁকে ধুঁকে জেলখানায় মরতে হতো অথবা বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা হতো।

















