রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে অবশেষে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত হয়েছে। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ায়। এই জয়ে লিওনেল মেসির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তার পায়ের জাদুতে ইংলিশ রক্ষণ ভেদ করে দুটি গোল তৈরিতে সহায়তা করেন তিনি। এই পারফরম্যান্সের পর মেসিকে ‘এল পিবে’ বা ‘দ্য কিড’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যা আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই উপাধিটি বিশ শতকের প্রথম দশকে ব্রিটিশদের শৃঙ্খলিত খেলার বিপরীতে আর্জেন্টিনার নিজস্ব ফুটবল ধারা তৈরির ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
ম্যাচ শেষে কিংবদন্তি লিওনেল মেসি আবেগে আপ্লুত হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। তিনি নিজেকে আর্জেন্টিনার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিচ্ছবি হিসেবে বর্ণনা করেন। মেসি বলেন, ‘দেশের মানুষকে আমরা আনন্দ দিতে পেরেছি—এতেই আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের চাকরি নেই, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে জীবনযুদ্ধে—এমন জীবনই তো আমাদের চিরকাল পার করতে হয়েছে। সেসব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা এবং টানা দুবার এই কীর্তি গড়া অসাধারণ ব্যাপার।’
আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন যখন জাতীয় দলে মেসির ধারাবাহিক ব্যর্থতায় তার আর্জেন্টাইন সত্তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হতো। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই মেসিই এখন আর্জেন্টাইনদের মন সবচেয়ে ভালো বোঝেন। ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, বেকহামের লাল কার্ড—এমন সব স্মৃতির মাঝে মেসি জানতেন, ফিফা সূচি অনুযায়ী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টাইনদের জন্য ফাইনাল। এই ম্যাচে জয় ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
মেসি সেই ‘বিকল্প’ রাখেননি। প্রথমার্ধে জুড বেলিংহামের সঙ্গে কথা-কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। যেন ‘কিংডম অব হেভেন’ সিনেমার দুই নাইটের দ্বন্দ্ব। মেসি যেন বুঝিয়ে দেন, বিশ শতকেই তারা ব্রিটিশদের শৃঙ্খলার শিকল ভেঙেছে এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই লড়াই আর প্রীতিসম্মেলন নয়। আর্জেন্টিনার মেধা, সামর্থ্য এবং উইং প্লের কাছেই ইংল্যান্ড হার মেনেছে।
মেসির চোখে চোখ রেখে বলা কথাগুলো আর্জেন্টাইনদের গোল করার পরিতৃপ্তি দিয়েছে। আর্জেন্টাইনরা এমন একজন নেতা চেয়েছে যে তাদের মন বুঝবে। মেসিও যেন ইংলিশদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, ৪০ বছর আগে তারা ‘ঈশ্বরের হাত’ দেখলেও, এবার তারা ‘ঈশ্বরের পা’ দেখবে। এনজো ফার্নান্দেজের গোলটি মেসির বাঁ পা থেকে আসে এবং লাওতারো মার্তিনেজের গোলেও তার অবদান ছিল। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ সেমিফাইনালের আগে ভুল বলেছিলেন যে ইংল্যান্ড ‘ঈশ্বরের বাঁ পা’ দেখবে; আসলে তারা দেখেছিল ‘ঈশ্বরের পা’।
ইব্রাহিমোভিচ আর্জেন্টাইন না হওয়ায় হয়তো বুঝতে পারেননি, যে ইংল্যান্ডের শৃঙ্খলার বাইরে বেরিয়ে আর্জেন্টাইনরা ফুটবলে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে, তাদের সামনে পেলে আর্জেন্টাইনদের কেমন লাগে। মেসি নিজেও বলেছেন, ‘সমর্থকেরা অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে এ ম্যাচ বেশি করে জিততে চেয়েছ। কারণ, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া এবং আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার তাৎপর্যই আলাদা।’
জিততে না পারলে কী হতো, তা মেসি জানতেন। ফুটবল নিয়ে আর্জেন্টাইনদের আবেগ সব সময় স্রোতস্বিনী নদীর মতো। শুধু জিতলে জলটা শীতল, হারলে গায়ে ফোসকা পড়ে। অতীতে এমন বহু ফোসকার দাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মেসির চাওয়া সেই শীতল জলটুকু। তিনি বলেন, ‘হারলে মানুষ আজেবাজে কথা বলার সুযোগ পেয়ে যেত, আমরা তাদের সেই সুযোগ দিইনি। আমরা জানতাম, ফুটবলে আমরা তাদের চেয়ে ভালো। কোনো আর্জেন্টাইন ম্যাচটি হারতে চায়নি।’
কোনো আর্জেন্টাইন কখনো কোনো ফুটবল ম্যাচ হারতে চায় না। কখনো কখনো তারা যেন সবকিছু আগেই টের পেয়ে যায়। মেসি বলেন, ‘জাতীয় সংগীত বাজার সময় থেকেই অন্য রকম অনুভূতি কাজ করছিল। পুরো দলই সেটা টের পেয়েছে।’ তারা জয়ের বিশ্বাস টের পেয়েছে। ‘এল পিবে’র একটি বড় ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস। মেসি বলেন, ‘আমরা কখনো বিশ্বাস হারাইনি, চেষ্টা করা থামিয়ে দিইনি। স্কোরবোর্ডে পিছিয়ে পড়ার পরও আমরা আমাদের চেনা ছন্দেই খেলেছি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেও দলের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। জানতাম আমরা ফাইনালে যাব।’
ফাইনালে ওঠার পর মেসির মুখের হাসি ছিল দেখার মতো। বোরোকোতো ‘এল পিবে’র সংজ্ঞায় লিখেছিলেন, ‘অল্প বয়সী একটি ছেলে, চিরুনির অবাধ্য চুল, কিন্তু চোখ দুটো বুদ্ধিদীপ্ত ও কৌশলে ভরপুর…ছবির মতো সুন্দর হাসি…ড্রিবলিংয়ের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে…এমন ভাস্কর্য কোনো এক দিন গড়লে অনেকেই হয়তো হ্যাট খুলে সম্মান দেখাবে, যা গির্জায় করে।’
ইট-পাথর কিংবা ইস্পাতের ভাস্কর্যের এখন আর কী প্রয়োজন? অমন ভাস্কর্য আছে কোটি ভক্তের হৃদয়ে। তার বেদিতে অর্ঘ্য রেখে চলা সমর্থকদের প্রতি ‘এল পিবে’র আহ্বান, ‘আমরা যেভাবে মুহূর্তটি উপভোগ করছি, আপনারাও সেভাবে উপভোগ করুন। যেভাবে আনন্দ করছেন, চালিয়ে যান। আমরা শেষ ধাপটি পার করে ফেলেছি এবং যা আমাদের সবার চাওয়া ছিল, তা অর্জন করেছি—একদম শেষ বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছানো, বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা। আর বরাবরের মতোই, বাকিটা এখন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।’
সৃষ্টিকর্তার কী ইচ্ছা, তা আগেভাগে জানা যায় না। তবে কিছু ইঙ্গিত থাকেই। জুলিয়ানো সিমিওনের কথায় সেটা বুঝে নিতে পারেন, ‘লিওর বয়স ৩৯ বছর। একজন ফুটবলার যা কিছুর স্বপ্ন দেখতে পারে, সবই তার আছে। তবু লড়াইটা চালিয়ে যায়। তাই আমাদের দায়িত্ব একটাই—সবকিছু উজাড় করে দিয়ে তার ও আর্জেন্টিনার জন্য দৌড়ানো।’
আসলে এমনই কথা ছিল। ‘এল পিবে’ বল পায়ে দৌড়াবেন আর্জেন্টিনার জন্য। সতীর্থরা দৌড়াবেন তাঁর এবং দেশের জন্য। সমর্থকেরা দেখবেন সেই দৌড়, তাঁর একেকটি মুভে জীবনটা আরও একটু জীবন্ত হয়ে ওঠার আনন্দ নিয়ে। তারপর একদিন সেই দৌড় থামলে? আর্জেন্টিনার সাবেক ফার্স্ট লেডি ও তাদের ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ ইভা পেরনকে নিয়ে ১৯৭৬ সালে একটি গানের অ্যালবাম বের করেছিলেন ইংরেজ গায়িকা জুলি কোভিংটন। সেই অ্যালবামের একটি গানের লাইনে উত্তরটি খুঁজে পেতে পারেন, ‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি আর্জেন্টিনা। দ্য ট্রুথ ইজ আই নেভার লেফট ইউ।’
৮৪ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা পিছিয়ে ছিল ১–০ গোলে।
‘এল গ্রাফিকো’র সম্পাদক রিকার্দো লোরেঞ্জো ‘বোরোকোতো’ ১৯২৮ সালে তাঁর লেখায় ‘এল পিবে’র ধারণা দেন।কেউ কেউ দাবি করতেন, ডিয়েগো ম্যারাডোনা ‘এল পিবে’র শ্রেষ্ঠ রূপকার।

















