পেশায় নির্মাণ শ্রমিক পাবনার মো. সোহাগের স্ত্রী সিমা আক্তার জন্মগত হার্টের ছিদ্রজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। দেশের চিকিৎসকরা ওপেন হার্ট সার্জারির পরামর্শ দিলেও ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হেলথ হাসপাতালে গিয়ে সোহাগ জানতে পারেন, অস্ত্রোপচার ছাড়াই কেবল ওষুধের মাধ্যমে তার স্ত্রীর চিকিৎসা সম্ভব। এমন অভিজ্ঞতার পর দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সোহাগের মতো সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমশ কমছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক দশক আগেও কেবল বিত্তবানরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতেন, কিন্তু বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। ধনী ও ভিআইপিদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ এখন চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী। রোগীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্তত ১৯টি দেশ।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরাও রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের (২০২৫) ৮ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান। এছাড়া সদ্যবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা গত বছরগুলোতে বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশে সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবসহ প্রায় ২১টি কারণে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। প্রতিবছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক অনুষ্ঠানে জানান, চিকিৎসার পেছনে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) তথ্যমতে, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয় এবং চিকিৎসার মোট খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীদের পকেট থেকে মেটাতে হয়। গবেষকরা এই ব্যবস্থাকে ‘পশ্চাদগামী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পর্যটন ভিসায় গিয়ে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা প্রকৃত খরচের তুলনায় অনেক কম। মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নেন প্রায় সাড়ে ৮ লাখ বিদেশি। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সেবা নেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকরা; দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশিরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশিরা ২০১৯ অর্থবছরে ২ দশমিক ২ মিলিয়ন, ২০২০ অর্থবছরে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন, ২০২১ অর্থবছরে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন এবং ২০২২ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য শূন্য দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা জরুরি হলেও বাংলাদেশে তা ১ শতাংশের নিচে। পর্যাপ্ত আধুনিক সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবলের অভাবও এর অন্যতম কারণ। বর্তমানে ঢাকায় ভারত, চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় শতাধিক হাসপাতালের অফিস রয়েছে, যারা ভিসা প্রসেসিং থেকে শুরু করে যাতায়াত ও ভাষাগত সহায়তা দিয়ে রোগীদের আকৃষ্ট করছে।
ঢাকাস্থ ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশি মেডিকেল ট্যুরিস্টরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যায় ভারতে। ২০২২ সালে ভারত সরকার ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ভিসা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ মেডিকেল ভিসা। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার শিথিলতার কারণে সাধারণ রোগব্যাধিতেও বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে কাজ করছে এবং আশা করা হচ্ছে শিগগিরই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।

















