গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করা এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। নেতানিয়াহু এবং তার সরকারের কট্টরপন্থি মিত্ররা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি রোডম্যাপ এবং গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হামাসকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানকে ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের ওপর সরাসরি ভেটো হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি মূলত পারস্পরিক পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং পর্যায়ক্রমে ইসরাইলি বাহিনীর সরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নেতানিয়াহু এই সমীকরণ বদলে দিয়ে দাবি করেছেন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সেনা প্রত্যাহার অসম্ভব। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই নিরস্ত্রীকরণের মানদণ্ড কে নির্ধারণ করবে বা কে তা যাচাই করবে। যদি ইসরাইল একতরফাভাবে এই নিরস্ত্রীকরণের সংজ্ঞায়ন করে, তবে গাজায় ইসরাইলি সামরিক উপস্থিতি অনির্দিষ্টকাল বজায় থাকার পথ প্রশস্ত হবে, যা ট্রাম্পের প্রস্তাবের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে যে প্রশ্নটি এড়িয়ে এসেছে, তা আবারও সামনে চলে এসেছে—যখন কোনো পরাশক্তি তার মিত্রকে নিজস্ব কূটনীতির শর্ত নির্ধারণের সুযোগ দেয়, তখন বাস্তবে কী ঘটে? ট্রাম্প চেয়েছিলেন গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য প্রমাণ করতে, কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই রাজনৈতিক পরাজয়। নেতানিয়াহু বরাবরই ইসরাইলি আগের সরকারগুলোর মতো একই কৌশল অবলম্বন করছেন—সময়ক্ষেপণ করা, নিরাপত্তার দোহাই দেওয়া এবং মার্কিন চাপের মুখে অনড় থাকা। তিনি জানেন, সংঘাতের রাজনৈতিক মূল্য বাড়লে একসময় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন এই রাজনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিলেও, নেতানিয়াহুর এই অনমনীয় মনোভাব ওয়াশিংটনের ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করছে। ইসরাইল নিয়মিতভাবে মার্কিন নীতি উপেক্ষা করলেও এর জন্য কোনো বড় মাশুল তাদের গুনতে হয় না। এখন ট্রাম্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যদি ইসরাইল তার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করতেই থাকে, তবে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন? সামরিক সহায়তার শর্ত জুড়ে দেওয়া বা অস্ত্র সরবরাহ ধীর করার মতো রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার সদিচ্ছা ছাড়া মার্কিন নেতৃত্বের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কেবল লোকদেখানো অভিনয় হিসেবেই গণ্য হবে। ক্ষমতা প্রয়োগের সদিচ্ছা না থাকলে মার্কিন কূটনীতি যে কতটা অসহায়, গাজার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই অভিজ্ঞতা তা আবারও প্রমাণ করল।

















