২০২৪ সালের ৩ আগস্ট (শনিবার) বা ৩৪ জুলাই রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম বিকেল ৫টার দিকে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এই ঘোষণা দেন এবং শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। এর আগে ৩৪ জুলাই (শনিবার) সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু নাহিদ ইসলাম তা স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি শুধু মন্ত্রিসভার পদত্যাগই দাবি করেননি, বরং আন্দোলনের সময় সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের জন্য বিচার দাবি করেন।
নাহিদ ইসলাম জনগণকে দেশব্যাপী ‘ছাত্র-জনতার গণ-জাগরণ’-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং একটি জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি ৪ আগস্ট (৩৫ জুলাই) থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরুর ডাক দেন। এই আন্দোলনের রূপরেখা হিসেবে সমন্বয়কারী আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ১৫ দফা ঘোষণা করেন, যার মধ্যে কর ও ইউটিলিটি বিল প্রদান বন্ধ রাখা, সব অফিস-আদালত ও কল-কারখানা বন্ধ রাখা এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও, পুলিশ ও আমলাদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সমাবেশটি সন্ধ্যা ৬টার দিকে শেষ হয়। বিক্ষোভকারীরা টিএসসি এলাকায় রাজু ভাস্কর্যের চোখ লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয় এবং সন্ধ্যা ৭টায় শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। এর আগে সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ শহীদ মিনারের দিকে আসতে শুরু করে এবং পুরো এলাকা ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও মিরপুর রোডসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে। মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সমাবেশ করেন।
একই দিনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোও প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। রাজধানীর বাইরেও সাভার, সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় বিক্ষোভকারীরা আক্রান্ত হয় এবং চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। গাজীপুরে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বগুড়ায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে ছয়জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া, আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় রংপুরে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

















