বাংলাদেশে প্রতিহাজার জীবিত জন্মে প্রায় ১৯ জন শিশু জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট বা অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট নামে পরিচিত হৃৎপিণ্ডের এই ছিদ্রজনিত সমস্যার কারণে শিশুরা হৃদরোগের কষ্টের পাশাপাশি মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে। হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকলে শরীরের রক্ত পাম্প হতে বাধা পায়, ফলে হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এতে শিশুর শরীরে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয় এবং ক্যালোরির চাহিদা বেড়ে যায়। অথচ শ্বাসকষ্ট ও দ্রুত ক্লান্ত হওয়ার কারণে এসব শিশু ঠিকমতো খেতে পারে না, যা তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং নিউমোনিয়ার মতো বারবার বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে মায়ের দুধই সবচেয়ে কার্যকর। শিশু সরাসরি দুধ টানতে না পারলে এক্সপ্রেসড ব্রেস্ট মিল্ক চামচ বা কাপে খাওয়ানো যেতে পারে। ছয় মাস বয়স পার হলে ক্যালোরি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ শক্ত খাবার দিতে হবে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম, মুরগির মাংস, ছোট মাছ, ডাল, চিনাবাদাম ও দই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। ভাতের সঙ্গে ঘি বা সরিষার তেল মিশিয়ে ক্যালোরির ঘনত্ব বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া কলা, মিষ্টিআলু ও পাকা পেঁপে শক্তির ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে। রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে পালংশাক, লালশাক ও পুঁইশাকের মতো আয়রনসমৃদ্ধ শাকসবজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়রন শোষণে সাহায্য করতে লেবু, আমলকী বা পেয়ারার মতো ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত খাবার যোগ করা প্রয়োজন।
খাদ্যাভ্যাসে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। একবারে বেশি না খাইয়ে দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার অল্প অল্প করে খাবার দিতে হবে। খাবার হতে হবে ঘন অথচ নরম, যাতে গিলে ফেলতে শিশুর শ্রম কম লাগে। অতিরিক্ত তরল খাবার শিশুর পেট ভরাট করলেও পর্যাপ্ত ক্যালোরি দেয় না, তাই শক্ত খাবারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। লবণ ও চিনি হৃৎপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে, তাই চিপস, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার ও মিষ্টি পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ সামুদ্রিক মাছ বা রুই-কাতলা জাতীয় মাছ হৃৎপিণ্ডের প্রদাহ কমাতে দারুণ কার্যকর।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবার পুষ্টির দিকে নজর দিতে পারে না। তবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ পাওয়া যায়। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সাহায্য নেওয়াও জরুরি। অস্ত্রোপচারের আগে শিশু যত ভালো পুষ্টি পাবে, তার দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বাড়বে। একজন সচেতন মা ও পরিবারের সঠিক তত্ত্বাবধানই পারে হার্টে ছিদ্র নিয়ে জন্মানো শিশুকে একটি সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।
একজন সচেতন মা ও সচেতন পরিবারই পারে হার্টে ছিদ্র নিয়ে জন্মানো শিশুকে একটি সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক এবং প্রতিষ্ঠাতা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজইমেইল : amimuna10@gmail.com

















