আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুলিশের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন—সব ক্ষেত্রেই ছিল ব্যাপক বিতর্ক। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি এবং বাহিনীর কিছু সদস্যের ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক দিয়ে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসানোর মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেই সময় পুলিশের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারের মতো কাজ করত। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয় এবং অনেক কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এত কিছুর পরও পুলিশ কতটা বদলেছে?
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশে এখনো সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা রয়ে গেছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুকের মতে, রাজনীতিকরণের জায়গা থেকে পুলিশ ন্যূনতম বদলায়নি এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেই। তিনি উল্লেখ করেন, মামলা ও জিডি নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোরতা থাকলেও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আগের মতোই চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পুলিশ এখনো ১৮৬১ সালের পুরোনো আইন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি একটি স্বাধীন আইন ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সরকার কোনো অন্ধ নির্দেশ দিয়ে পুলিশ চালাবে না—এমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় আনুগত্যই ছিল পদায়নের মূল মাপকাঠি। বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহম্মেদ জানান, দলীয় অনুগত ছাড়া কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হতো না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক এসপি জানান, এখনো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নে দলীয় আনুগত্যের প্রভাব রয়ে গেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও ক্লিপগুলোতে ঘুষের বিনিময়ে বদলি ও সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার প্রমাণ মিলছে।
সম্প্রতি বেশ কিছু গুরুতর অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত ৬ জুলাই খুলনার শিরোমণিতে রাত আড়াইটার দিকে একটি ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৭-৮ জন মুখোশধারী ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র হাতে এক বাড়িতে প্রবেশ করে। এছাড়া রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের এসআই মো. মহিউদ্দিনের ঘুষ লেনদেনের অডিও এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসির ‘পুলিশের চাকরি এক ধরনের ব্যবসা’—এমন মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা এখনো থানায় মামলা করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গত বছরের ১৮ মে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মগবাজার গ্রিনওয়ে গলিতে তিন ছিনতাইকারী চাপাতি হাতে প্রকাশ্যে ছিনতাই করে। ভুক্তভোগী মো. আবদুল্লাহ জানান, আহত অবস্থায় ভোর ৬টার দিকে হাতিরঝিল থানায় গিয়ে ক্ষতচিহ্ন দেখালেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে নজরকাড়া পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, যথেচ্ছ গ্রেফতার বা গুমের নাটক থেকে পুলিশ পুরোপুরি সরে এসেছে এবং ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে জনগণের কাছে পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তা অনেক সময় ভুল বার্তা দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

















