প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় অভিযুক্ত কেএএম মাজেদুর রহমানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত। ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বর্তমানে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগসাজশে মাজেদুর রহমান এই বিশাল অংকের অর্থ আত্মসাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, মাজেদুর রহমানের সিন্ডিকেটে থাকা অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দুদকের নথিপত্র অনুযায়ী, এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবার অফিস ভাড়া বাবদ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা, মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার কোটি টাকা, ঋণ বিতরণের নামে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা এবং স্টেশনারি খাতে ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও ভুয়া প্রচারণার নামে অর্থ পাচার ও এফডিআর জালিয়াতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে তদন্তে।
ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী পর্ষদের সদস্য সচিব হিসেবে মাজেদুর রহমান চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। দুদকের অনুসন্ধানে দুটি স্পষ্ট অনিয়মের নথিতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের ৯০১ (৯০১) নম্বর সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হলেও মাত্র ২৫ হাজার প্রতিবেদন তৈরি করে ৬৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। এতে প্রায় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। একইভাবে ২০১২ সালে ক্যালেন্ডার তৈরির নামেও ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুই কার্যাদেশ মিলিয়ে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য দুদকের হাতে রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিএফআইইউ-এর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়মে মাজেদুর রহমানকে অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর থেকে মাজেদুর বিদেশে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে আদালতের অনুমতি চেয়ে এলেও দুদক তার কঠোর বিরোধিতা করছে। দুদকের আশঙ্কা, তাকে বিদেশে যেতে দিলে চলমান অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এরই মধ্যে বনানীতে অবস্থিত এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন ইকবাল সেন্টার সিলগালা করেছে দুদক এবং বিপুল পরিমাণ নথি জব্দ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাজেদুর রহমান বলেন, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি দাবি করেন, ক্যালেন্ডার ও বিজ্ঞাপনের অনিয়মের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং ব্যাংকে সদস্য সচিব বলে কোনো পদ নেই। তিনি আরও বলেন, দুদকের যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে তা মূলত থার্ড পার্টির অডিট রিপোর্ট এবং কমিশন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত করেনি। তবে দুদক জানিয়েছে, প্রিমিয়ার ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৬টি মামলার অনুসন্ধান চলছে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।

















