২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর থেকে তীব্র হতে থাকা এই আন্দোলন জুলাইয়ের শেষ দিকে রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ২ আগস্টের জন্য প্রার্থনা ও গণমিছিলের ডাক দেয়। ২ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। সেদিনই আন্দোলনকারীরা ৩ আগস্ট সারা দেশে বিক্ষোভ ও ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। একই দিনে ইউনিসেফ কোটা আন্দোলনে অন্তত ৩২ জন শিশু নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেন যে, তারা শেখ হাসিনাকে বিচারের আওতায় আনতে চান এবং কোনোভাবেই তাকে এক্সিট রুট দিতে রাজি নন। সেদিনই তারা ৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এগিয়ে ৫ আগস্টে নিয়ে আসার ঘোষণা দেন। ৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। এদিন সরকার ফোর-জি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং সান্ধ্য আইন জারি করে। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়াসহ অনেক সেনা কর্মকর্তা সশস্ত্র বাহিনীকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন আইনপ্রণেতাও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
৫ আগস্ট কারফিউর মধ্যেই সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা ঢাকার দিকে রওনা হয়। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সেনাবাহিনী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও মানুষের স্রোত শাহবাগের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। দুপুর নাগাদ খবর আসে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে ভারতে পালিয়ে গেছেন। বিকেলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
এই আন্দোলনের পুরো সময়কালে সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে, তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট মাসে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের ঘটনার পরপরই গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবন আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতি জাদুঘরসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর ৬ আগস্ট ভোর থেকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।

















