চারুকলা শিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো একসময় অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলেন যে, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ছায়ার মধ্যেও তিনি নানা রঙের ছটা দেখতে পান, যা তার ছাত্রছাত্রীদের চোখে ধরা পড়ে না। শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন সবাই হয়তো তার মতোই পৃথিবীটাকে দেখে, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। এক ছাত্রীর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, তারা তাকে শিক্ষিকা হিসেবে সম্মান করে বলেই হয়তো তার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করেনি। পরবর্তীকালে জিনগত পরীক্ষায় জানা যায়, তার মধ্যে ‘টেট্রাক্রোম্যাসি’ নামক এক বিশেষ বাড়তি দৃষ্টিশক্তির জৈবিক সম্ভাবনা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের চোখে তিনটি বিশেষ ‘কোণ’ কোষ থাকে, যা লাল, সবুজ ও নীল রঙের সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায়। কিন্তু যাদের চোখে চতুর্থ আরেকটি কোণ কোষ থাকে, তাদের রেটিনাল টেট্রাক্রোম্যাসি বলা হয়। এই বাড়তি কোষের কারণে তাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি সংকেত পায়, যা পৃথিবীকে সাধারণের চেয়ে অধিক রঙিন করে তোলে। যেহেতু এই রঙের সংবেদনশীলতার জিনগুলো ‘এক্স’ ক্রোমোজোমে থাকে, তাই সাধারণত জৈবিকভাবে নারীরাই টেট্রাক্রোম্যাটিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। যুক্তরাজ্যের নিউকাসল ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২ শতাংশ নারীর এই বিশেষ জিনগত ক্ষমতা থাকতে পারে।
তবে কেবল অতিরিক্ত কোণ কোষ থাকলেই যে রং দেখার ক্ষমতা বেড়ে যায়, বিষয়টি তা নয়। ড. কিম্বার্লি এ. জেমসন এটিকে ‘ফাংশনাল টেট্রাক্রোম্যাসি’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা প্রমাণ করা বেশ জটিল। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত কোণ কোষযুক্ত নারীরা রঙের বর্ণালীর সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো সাধারণ ট্রাইক্রোম্যাটদের চেয়ে অনেক স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারেন। পশু-পাখিদের ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়; যেমন, ট্রাইক্রোম্যাট স্ত্রী বানরেরা ডাইক্রোম্যাট পুরুষদের চেয়ে লাল ফল দ্রুত খুঁজে পেতে সক্ষম হয়।
টেট্রাক্রোম্যাটরা ঠিক কী দেখেন, তা নিয়ে দার্শনিক ড. মাইকেল নেওয়ালসহ অনেক বিশেষজ্ঞই গবেষণা করছেন। একটি ধারণা হলো, তারা এমন সব রং দেখেন যা বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তারা সাধারণ রঙের মধ্যকার অতি সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো অসাধারণভাবে বুঝতে পারেন। ড. জেনি বোস্টেনের মতে, এটি পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন কারণ আধুনিক ডিজিটাল স্ক্রিনগুলো কেবল তিনটি রঙের চ্যানেলে সীমাবদ্ধ।
টেট্রাক্রোম্যাসির কিছু সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে রঙের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং উজ্জ্বল ফ্লুরোসেন্ট আলোর প্রতি অস্বস্তি। ড. জেমসন জানান, অনেক টেট্রাক্রোম্যাটিক নারী তীব্র আলো সহ্য করতে পারেন না এবং সবসময় অনুভব করেন যে তাদের দৃষ্টি অন্যদের থেকে আলাদা। কনসেত্তা আন্তিকো মনে করেন, দীর্ঘদিনের অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি তার এই বিশেষ দৃষ্টিশক্তিকে আরও শাণিত করেছেন। যদিও ফাংশনাল টেট্রাক্রোম্যাসি নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক রয়েছে, তবুও এই জিনগত মিউটেশনকে কনসেত্তা আন্তিকো একটি সৌভাগ্য এবং নিজের জীবনকে সুন্দর করার মাধ্যম হিসেবেই দেখেন।

















