চিকিৎসা মানুষের এক মৌলিক প্রয়োজন, যা শরীর, মন ও মানসিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচীনকালে মানুষ অসুস্থ হলে বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতিতে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করত এবং রোগীর বাড়তি সেবা-যত্ন দিত। তখন বর্তমানের মতো সুসংগঠিত হাসপাতাল ব্যবস্থা ছিল না; ঘরই ছিল মানুষের চিকিৎসালয়। জটিল রোগের ক্ষেত্রে রোগীরা ধর্মীয় মনীষীদের শিবির বা আশ্রমে আশ্রয় নিত। গ্রিক, রোমান ও মিসরীয় সভ্যতায় চিকিৎসা শাস্ত্রের কিছুটা উন্নতি হলেও, মধ্যযুগে মুসলিম শাসক ও বিজ্ঞানীদের কল্যাণেই এর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়।
‘Hospital’ শব্দটি ল্যাটিন ‘Hospes’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘নিয়ন্ত্রণকর্তা’। এর আভিধানিক অর্থ চিকিৎসাগার। মধ্যযুগে আজকের হাসপাতালকে ফার্সি ভাষায় ‘বিমারিস্তান’ বলা হতো, যার অর্থ রোগীর স্থান।
চিকিৎসা শাস্ত্রে ইবনে সিনা, আল-বেরুনি, আত-তাবারি, আর-রাজি, ইবনে রুশদ, আলি আল মাওসুলির মতো মহাপুরুষদের নাম ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাদের হাতেই চিকিৎসা শাস্ত্রের সূচনা ও জয় হয়েছিল। তারা আল কোরআন ও হাদিস থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রের ধারণা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিলেন এবং মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন তাদের আদর্শ।
মহানবী (সা.)-এর যুগে অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষা করা হতো দুটি উপায়ে। যুদ্ধের ময়দানে আহত সাহাবিদের জন্য তিনি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যোপযোগী স্থানে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিতেন, যা ছিল অস্থায়ী হাসপাতাল। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানরা চিকিৎসাসেবার জন্য স্বতন্ত্র তাঁবু স্থাপন করেছিল। সাদ ইবনে মুআজ (রা.) আহত হলে রাসুল (সা.) তাকে এই তাঁবুতে রাখার নির্দেশ দেন। এসব তাঁবুতে নারীরা আহতদের সেবায় নিয়োজিত থাকতেন। আজকের পৃথিবীর ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল ও চিকিৎসার ধারণা এখান থেকেই এসেছে বলে মনে করা হয়।
পরবর্তী খলিফা ও শাসকদের আমলেও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু ছিল। উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান (৬৪৬-৭০৫) বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তৎকালীন প্রথিতযশা চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। রোগীর শ্রেণি অনুযায়ী পৃথক বিভাগ এবং প্রতিটি বিভাগের জন্য পারদর্শী চিকিৎসক নিযুক্ত ছিলেন, যারা সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতেন। রোগীর বাড়তি সেবার জন্য নার্সও ছিল। পুরুষ ও নারীর জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা ছিল এবং হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে নানা রঙের ফুল ও ফলের বৃক্ষ পরিবেশকে সুখকর ও আনন্দদায়ক করে তুলত।
খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের সন্তান আল ওয়ালিদ ইবনে মালিক (৬৬৮-৭১৫), যিনি ৭০৫ থেকে ৭১৫ সাল পর্যন্ত খলিফার পদে আসীন ছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মানসিক হাসপাতাল নির্মাণ করেন। তার পর থেকেই মানসিক রোগের চিকিৎসায় বিজ্ঞানীরা উন্নতি সাধন শুরু করেন। তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি কুষ্ঠব্যাধির চিকিৎসার জন্যও বিখ্যাত ছিল এবং সেখানে ডাক্তারদের জন্য মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা নির্ধারিত ছিল।
আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৬৬-৮০৯) ৮০৫ হিজরীতে ইরাকের বাগদাদে একটি সাধারণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ৩০টিরও বেশি এমন হাসপাতাল গড়ে ওঠে। তিনি বাগদাদের বিখ্যাত গ্রন্থাগার বাইতুল হিকমাহও প্রতিষ্ঠা করেন। ৮৭২ সালে আহমদ ইবনে তুলুন মিশরের কায়রোতে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যা আহমদ ইবনে তুলুন হাসপাতাল নামে পরিচিতি লাভ করে।
নবম শতকে তিউনিসিয়ায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যযুগের সেরা, বিস্তৃত বিন্যাসের ও পরিবেশবান্ধব হাসপাতালটি শাসক ওদুদ আল ওয়ালিদ ৯৮২ সালে বাগদাদে নির্মাণ করেন। এই হাসপাতালে ২৫ জন চিকিৎসক ছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। দশম শতকে কারাগারের কয়েদিদের সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জন্য জেলের ভেতর মিনি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। হাসপাতালের নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা প্রতিদিনই বন্দিদের পরীক্ষা করতেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন।
দ্বাদশ শতকে কায়রোতে ‘নাসিরি’ এবং ‘মানসুরি’ নামে দুটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সময়ে ইরানের রাইত শহরে জগতের অন্যতম মনীষী বিজ্ঞানী আল-রাজি একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামি শাসনামলে বাগদাদ, কর্ডোবা, দামেস্ক, কায়রোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে অসংখ্য হাসপাতাল গড়ে ওঠে। শুধু স্পেনের কর্ডোবা শহরেই ৫০টিরও বেশি হাসপাতাল ছিল, যার মধ্যে কিছু সামরিক বাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বর্তমান বিশ্বের সামরিক বাহিনীর জন্য প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের ধারণাটি মুসলমানদের থেকেই এসেছে। প্রখ্যাত ড. ডানল্ড ক্যম্বল লিখেছেন, কর্ডোবায় ইসলামী শাসনামলে প্রায় ৫০০ চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল, যার মধ্যে ‘আল জেকিরাজ’ অন্যতম। সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত রাজ চিকিৎসকরা এটি পরিদর্শন করতেন। কার্যনির্বাহী পদে শুধু মুসলমানরাই নয়, অভিজ্ঞ, কৌশলী ও পরিশ্রমী অনেক ইহুদি ও খ্রিস্টানও যুক্ত ছিলেন।
মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশেও অনেক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসাসরঞ্জাম, ওষুধ-পথ্য মজুত থাকত। অন্যান্য চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে অস্ত্রোপচারের জন্য আলাদা বিভাগ এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রোপচারের জন্য আলাদা সার্জনও ছিলেন। সুলতান নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জংগি (মৃত্যু ১১৭৪) মুসলিম শাসকদের মধ্যে একজন কীর্তিমান ছিলেন। তিনি দামেস্ক নগরীতে একটি বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল নূরী হাসপাতাল। সেখানে সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা ছিল এবং যুগশ্রেষ্ঠ চিকিৎসকগণ চিকিৎসা কর্মে নিযুক্ত ছিলেন। হাসপাতালের উন্নয়নে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। হাসপাতাল সংলগ্ন জমিনে তিনি একটি বিশাল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপুল বই ছিল। সমৃদ্ধ ও বিরাট সেই লাইব্রেরি এখনও বিদ্যমান। ইতিহাসের অনেক পর্যটকদের লেখায় নূরী হাসপাতাল ও তার লাইব্রেরির কথা উঠে এসেছে। হাসপাতালের প্রধান মুখ্য চিকিৎসক ছিলেন আবুল হিকাম ওরফে ইবনুদ দাখওয়ার, এবং ইবনু আবি উসাইবা, ইবনু নাফিস ছিলেন তাঁর সহকারী। তারা ব্যক্তিগতভাবে রোগীদের খোঁজখবর নিতেন। হাসপাতালে একজন প্রধান চিকিৎসক ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন, যিনি প্রতিদিন রোগীদের ভিজিট করতেন এবং কে বাড়ি যেতে পারবে সে ব্যাপারে আদেশ লিখতেন। তারা যখন রোগী দেখতে যেতেন, তখন তাদের পেছনে থাকত নার্স বা সেবকদের কাফেলা।
ভারতে মুসলিম শাসকদের মধ্যে ফিরোজ শাহ তুঘলক (শাসনামল-৭৫২ হিজরি) একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে তখন ‘সিহহত খানা’ বলা হতো। সুলতান হাসপাতালে কয়েকজন চিকিৎসক নিয়োগ দেন এবং হাসপাতালের পক্ষ থেকে রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হতো। সুলতান হাসপাতালের ব্যয় বহনের জন্য বেশকিছু জমি ওয়াকফ করে দেন। ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহি’তে একটি হাসপাতালের উল্লেখ পাওয়া গেলেও, ঐতিহাসিক আবুল কাসেম ফেরেশতা লিখেছেন যে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক মোট পাঁচটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল বাদশাহদের মধ্যে জাহাঙ্গীর সর্বপ্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন এবং গুরুত্বের সঙ্গে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সেকালের একজন প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হেকিম আলি প্রতি বছর দরিদ্রদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ওষুধ বিলি করতেন। মুঘল সম্রাট আকবরও অনেক সরাইখানা নির্মাণ করেন, যার কোথাও কোথাও চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। তার অধীনে মন্ত্রীবর্গ ও বিভিন্ন আমলারাও সরাইখানা তৈরি করেন।
এভাবে ইসলামি শাসনামলে মুসলমানরা বিভিন্ন শহর ও গ্রামে মানুষের চিকিৎসা প্রদানের জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং হাসপাতালের কাজ সম্প্রসারণ করেন। রোগীদের প্রতি যথার্থ সেবা ও মূল্যায়নের দিকে তারা অধিক গুরুত্ব দিতেন। আন্তরিকতা ছিল চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠাতার প্রধানতম ধর্ম, এবং মানুষের সেবায় ছিল তাদের ব্রত। প্রাতিষ্ঠানিক হাসপাতাল ছাড়াও মুসলমানরা ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে মানুষের চিকিৎসা দিতেন। মুসলিম মনীষীরা মানুষের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেছেন এবং যেসব সেবাধর্মী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, আধুনিক-উত্তর পৃথিবীতে আজ তার বড় অভাব। তাদের মতো নিবেদিতপ্রাণের হাসপাতাল আজ আর মানুষের চোখে পড়ে না।

















