রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে রয়েছে পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর আদর্শের অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। যথাস্থানে ও যথাসময়ে দরুদ পাঠ ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং এটি বিভিন্ন ক্ষতির কারণ হতে পারে.
একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও দরুদ পাঠ না করা ব্যক্তিদের জন্য অভিশাপ ও কঠিন পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক’, ‘সে ব্যক্তি জান্নাতের রাস্তা থেকে দূরে সরে থাকবে’, এবং ‘সে ব্যক্তি সবচেয়ে বড় কৃপণ’ – যে ব্যক্তির সামনে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে আর সে তাঁর ওপর দরুদ পড়বে না.
হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মসজিদের মিম্বারে উঠছিলেন, তখন তিনি তিনটি সিঁড়িতে পা রাখার সময় তিনবার ‘আমিন’ বলেছিলেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান যে, প্রথম সিঁড়িতে পা রাখার সময় জিবরাইল (আ.) বলেছিলেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যে পিতা-মাতা উভয়কে বা একজনকে পেয়েও তাদের খেদমত করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না।’ দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখার সময় জিবরাইল (আ.) বলেছিলেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যে রমজান মাস পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না।’ আর তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখার সময় জিবরাইল (আ.) বলেছিলেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যার সামনে আমার নাম আলোচিত বা উচ্চারিত হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পেশ করে না।’ এই সবকটি প্রার্থনার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘আমিন’ বলে সমর্থন জানিয়েছিলেন.
এ ছাড়া আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাসিকা ধূলায় ধূসরিত হোক’ অর্থাৎ সে অপমানিত হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয়েছে অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ে না। (তিরমিজি : ৩৫৪৫; মিশকাত : ৯২৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে, যে ব্যক্তি তাঁর নাম শোনার পরও দরুদ পাঠ করে না, সে অত্যন্ত কৃপণ। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের বলব, সবচেয়ে বড় কৃপণ কে?’ সাহাবিরা উত্তর দিলে তিনি বলেন, ‘যার সামনে আমার নাম নেওয়া হলো কিন্তু সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না; সে হলো সবচেয়ে বড় কৃপণ।’ (তিরমিজি : ৩৫৪৬)।
দরুদ পাঠ ভুলে যাওয়াকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের পথ ভুলে যাওয়ার সমতুল্য বলেছেন। হুসাইন বিন আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার নাম শোনার পরও দরুদ পাঠ করা থেকে দূরে সরে থাকবে; সে জান্নাতের রাস্তা থেকে দূরে সরে থাকবে।’
আরও বর্ণিত আছে যে, জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, ‘যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করল না। অতঃপর মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে তাঁর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিবেন।’ এই কথার সমর্থনে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘আমিন’ বলেছিলেন। (ইবনে হিব্বান : ২৩৮৭)।
কিয়ামতের দিন আফসোসের কারণ হওয়ার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতি কোনো বৈঠকে বসে এবং সেখানে যদি তারা আল্লাহকে স্মরণ না করে ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ না করে; তাহলে তাদের এ কাজটি কিয়ামতের দিন আফসোসের কারণ হবে, যদিও তারা পুরস্কার হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করে। (মুস্তাদরেকে হাকেম, ১/৫৫০)।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি হতভাগ্য; যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না। (আমাল, ইবনুস সুন্নি : ৩৮১)। তিনি আরও বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক, যার সামনে আমার নাম আলোচনা হলো; কিন্তু সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। (মিশকাত, ১/৮৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশ কিছু হাদিসে বলেছেন, 'সেই ব্যক্তি লাঞ্ছিত হোক (মিশকাত : ১/৮৬); সে ব্যক্তি জান্নাতের রাস্তা থেকে দূরে সরে থাকবে (আত-তারগিব : ৩৮৪); সে ব্যক্তি সবচেয়ে বড় কৃপণ (আত-তারগিব : ৩৮৫); যে ব্যক্তির সামনে আমার নাম উচ্চারিত হবে আর সে আমার ওপর দরুদ পড়বে না। (দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের বিধান, মুফতি সালমান মানসুরপুরী, অনুবাদ : মাওলানা মুহাম্মাদ নাঈম, রাহনুমা প্রকাশনী, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৫২৮)।
ধ্বংস ও অপমান অনিবার্য : একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদের মিম্বরের উঠার সময় তিনটি সিঁড়িতে পা রাখার সময় তিনবার 'আমিন' বলেছিলেন। নামাজান্তের উপস্থিত সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজকে এমন একটি কাজ আপনি করলেন; যা এর আগে কখনও আপনাকে করতে দেখিনি। এর কারণ কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, 'আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েছে অথচ তাদের খেদমত করে জান্নাতে অর্জন করতে পারল না। তখন আমি তাকে সমর্থন করে 'আমিন' বললাম। এরপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যে রমজান মাস পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি বললাম 'আমিন'। জিবরাইল (আ.) এরপর বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক; যার সামনে আমার নাম আলোচিতবা উচ্চারিত হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পেশ করে না। আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করে 'আমিন' বললাম।' (ইবনে হিব্বান : ৯০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ : ৬৪৬)।

















