রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার রিকশাচালক মো. আলমগীর জানান, আগে যেখানে দিনে তিন-চারবার নাশতায় তার খরচ হতো ২০ টাকা (একটি বনরুটি ও এক কাপ চা), সেখানে গত রবিবার থেকে তা বেড়ে ২৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বনরুটির দাম পিসপ্রতি ৫ টাকা বাড়ার কারণেই এই খরচ বৃদ্ধি। রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায়ই বেকারির তৈরি খোলা পাউরুটি (বনরুটি) ও কেকের দাম বেড়েছে। ঢাকার বাইরেও কিছু অঞ্চলে দাম না বাড়লেও পণ্যের আকার ও ওজন কমানো হয়েছে।
বেকারি মালিকদের মতে, গত দেড় থেকে দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তারা এই দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.০২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩২ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই বেশি, তার উপর রুটি-কেকের মতো বেকারি পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের খরচ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি জানিয়েছে, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত শনিবার থেকে রুটির দাম বাড়ানো হয়েছে। সংগঠনটি রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দাম এবং ওজন সমন্বয় করে সব মিলিয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। হাতে তৈরি বেকারি বিস্কুটের দাম কেজিতে গড়ে ২০ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা হয়েছে। বনরুটি ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ওজনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ৪০ গ্রাম ওজনের বনরুটি ও মাফিন কেকের দাম একই রেখে ওজন ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে। আবার ১০ বা ১২ টাকা দামের প্রতি পিছ বনরুটির দাম বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে, তবে এক্ষেত্রে আকার সামান্য বড় করা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর দাবিতে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেকারি কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। দুই দিন বন্ধ থাকার পর নতুন নির্ধারিত মূল্যে শনিবার সকাল থেকে বাজারে বেকারি পণ্য সরবরাহ শুরু হয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার, খিলগাঁও এলাকায় খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে রুটি ও কেক বিক্রি হচ্ছে। তবে খুলনা, চট্টগ্রাম, সাভার ও রাজশাহীর মতো কিছু এলাকায় রোববার পর্যন্ত আগের দামেই বিক্রি হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের এক চা বিক্রেতা জব্বার শেখ জানান, গত এক মাসে চা পাতা ও চিনির দাম বেড়েছে। রুটি-কেকের দাম বাড়ায় তার দোকানে বিক্রি কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৭ হাজার ক্ষুদ্র বেকারি রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ৭০০টির বেশি। রুটি ও বেকারি পণ্য তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি এবং গ্যাস। ব্যবসায়ীরা জানান, গত ছয় মাসে এসব কাঁচামালের দাম বেড়েছে। টিসিবির তথ্যমতে, ছয় মাস আগের তুলনায় খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন ৫ শতাংশ ও চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, গত এক বছরে কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে, বিপরীতে উৎপাদন কমেছে ১০-১৫ শতাংশ। এতে ছোট ও মাঝারি আকারের বেকারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের চাপে রয়েছেন। সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘রুটি ও কেক তৈরির কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই আমরা এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
সকাল-বিকেল মিলিয়ে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পায়ে টানা রিকশা চালান তিনি।
চিনির দামও আগের তুলনায় কেজিতে ৫-১০ টাকা বেড়েছে।

















