সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার বিশাল চরাঞ্চল প্রতি বছরই যমুনার ভাঙনের শিকার হয়। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধকলটি সহ্য করতে হয় এখানকার নারীদের। বন্যা, চরম দারিদ্র্য এবং যাতায়াতের সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যেও তারা পরিবার ও ভবিষ্যৎকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন। যমুনার করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে বারবার বসতবাড়ি স্থানান্তর করা তাদের নিত্যসঙ্গী। খাসরাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ ও মনসুর নগরের চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার নারী জীবনের নানা বঞ্চনার শিকার হয়েও টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছেন।
অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে অনেক বয়স্ক নারী অকাল মৃত্যুর শিকার হন। চরাঞ্চলের নারীদের প্রসূতি সেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তেকানী ইউনিয়ন থেকে মেঘাই পর্যটন কেন্দ্রের দিকে প্রসূতি মা বহনকারী একটি নৌকা যমুনায় ডুবে যায়, যদিও অল্পের জন্য তারা প্রাণে বেঁচে যান। জরুরি মুহূর্তে নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। এছাড়া সামাজিক বঞ্চনার কারণে নারীরা প্রায়ই তুচ্ছতাচ্ছিল্যর শিকার হন এবং শিক্ষার হারও প্রত্যাশিত নয়। অনেক কিশোরী পড়াশোনা ছেড়ে গৃহকর্মী বা কৃষি শ্রমিকের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।
জীবিকার সন্ধানে এই নারীরা কৃষি জমিতে মরিচ, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, মূলা, ভুট্টা, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা চাষ করছেন। সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য তারা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ ও ঘোড়া পালন করেন, যা চরের কাশবন ও লতা-পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠে। পীরগাছা চরের ৫৫ বছর বয়সী জহুরা বেগম জানান, জমি না থাকলেও সংসার চালানোর তাগিদে তাদের প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। চরগিরিশ চরের ৩৫ বছর বয়সী বিধবা আছিয়া খাতুন জানান, অন্যের জমিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা মজুরি পান তিনি।
কাজীপুরের চরাঞ্চলের নারীরা কেবল প্রতিকূলতার শিকার নন, তারা সাহসী এবং পরিবর্তনের পথিকৃৎ। যমুনা নদী তাদের জীবনকে বারবার ছিন্নভিন্ন করলেও তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। চরের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা এই সংগ্রামী নারীরাই প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে টিকে থেকে নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজছেন।

















