সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এই ঘটনার পর তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এসেছে। ৭৪ বছর বয়সী নজরুল ইসলাম ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং বর্তমানে তিনি তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। বহিষ্কারের আগে তিনি জামায়াতের সাতক্ষীরা জেলা আমিরের দায়িত্বে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবেও কাজ করছিলেন। বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশের পর তিনি দাবি করেছিলেন যে, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে নির্বাচনী এলাকায় ক্ষোভ ও বিতর্কের মুখে বুধবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি সভায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্যতার শর্তাবলি উল্লেখ থাকলেও, দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি সেখানে স্পষ্ট নয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি কেউ দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে। কিন্তু দল তাকে বহিষ্কার করলে কী হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বহিষ্কার হলে সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা। তবে অতীতে আবু হেনা ও লতিফ সিদ্দিকীর মতো নেতাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও আইনি ব্যাখ্যা দেখা গেছে। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তখন আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। এমন ঘটনা এরপর আরও ঘটেছিল। তবে আবু হেনার ঘটনাটি ঘটে ২০০৮ সালের আগে।
দশম সংসদে লতিফ সিদ্দিকীর বহিষ্কারের ঘটনাটি ছিল বেশ আলোচিত। সে সময় আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল যে, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্য থাকার আইনগত অধিকার হারিয়েছেন। বিতর্কিত মন্তব্য করার জেরে ২০১৪ সালে তখনকার সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে লতিফ সিদ্দিকী সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন দুই সপ্তাহের জন্য এ বিষয়ের সব কার্যক্রম স্থগিত করেন। এরপর ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকীর আসনটি শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন তখনকার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের বিষয়টি তারা নির্বাচন কমিশনকে জানাবে। যদিও জামায়াত ‘নৈতিক স্খলন’-এর কথা বলে বহিষ্কার করেছে, কিন্তু সংবিধানে নৈতিক স্খলনের ক্ষেত্রে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা বর্তমান ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে গাজী নজরুলের সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও আইনি ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল।

















