সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি জুলাই জাতীয় সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার উভয়কেই গুরুত্ব দেবে বলে জানিয়েছে। গত মঙ্গলবার কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে এই তথ্য জানানো হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সংবিধান সংস্কারের আলোচনায় কোন প্রস্তাবটি প্রাধান্য পাবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধান সংস্কারের আলোচনা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, যার মধ্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্যতম ছিল। বিভিন্ন অংশীজনদের মতামত ও জনমত জরিপের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি এই কমিশন বিস্তারিত সুপারিশ জমা দেয়। পরবর্তীতে ছয়টি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়। এই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানের মতো কিছু প্রস্তাব সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এসবের কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির ভিন্নমত ছিল, যা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত বিএনপির ইশতেহারে ‘রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার’ শিরোনামের অধীনে ‘সাংবিধানিক সংস্কার’ অংশে ৩৫টি প্রস্তাব ছিল। এই প্রস্তাবগুলোর কিছু জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কিছু বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে থাকার সুযোগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং উচ্চকক্ষের গঠন ও ক্ষমতা নিয়ে বিএনপির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানে পুনঃস্থাপনের কথা বলেছে। তারা সকল বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া, রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের কথাও উল্লেখ করেছে।
নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে বিএনপি তাদের ইশতেহারে জোর দিয়েছে। তারা বলেছে, এই ব্যবস্থার রূপরেখা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিএনপি বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাইরে রাখতে চেয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে মতভিন্নতা ছিল।
জুলাই সনদের প্রস্তাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের জন্য একটি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নাম প্রস্তাব ও বাছাইয়ের একাধিক স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই সম্ভব না হলে সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিরা মিলে নাম প্রস্তাব করবেন। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল; তারা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এটি নির্ধারণের পক্ষে মত দেয়।
প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ এবং দলীয় প্রধানের পদে থাকার বিষয়ে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও থাকতে পারবেন। এছাড়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথাও বলা হয়েছে, যদিও এর বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং পিএসসিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য নিয়োগের জন্য শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তরের প্রস্তাবও ইশতেহারে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ আইনানুসারে সরকার কর্তৃক হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষমতার ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে জুলাই সনদে বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সনদে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না। পিএসসি, দুদক, সিএজি ও ন্যায়পাল পদে নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব আছে, যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস করবে। তবে এসব বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল ছয়টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিইআরসি। সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কারও সুপারিশ ছাড়াই এসব পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বিইআরসি’র চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের এই বিধান নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।
সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তনের প্রস্তাব বিএনপির ইশতেহারে রয়েছে, যেখানে বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে। অন্যদিকে, জুলাই সনদের প্রস্তাবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের কথা বলা হয়েছে, যা একটি দল সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পাবে।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়েও দুই পক্ষের ভিন্নতা রয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থাভোট ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিল ছাড়া অন্যসব বিল উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে এবং উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ ১ মাসের বেশি আটকে রাখতে পারবে না। অন্যদিকে, জুলাই সনদের প্রস্তাবে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাসের কথা বলা হয়েছে। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া সব বিল উচ্চকক্ষে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে, তবে উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না এবং সর্বোচ্চ ২ মাসের বেশি আটকে রাখলে তা অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।
বিএনপির ইশতেহারে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার অঙ্গীকারও রয়েছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছিল, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ বিএনপির মতে, এর অর্থ হলো জুলাই সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ স্বাক্ষরিত হয়েছে, কারণ সনদের প্রস্তাবগুলোর পাশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত অংশে একটি নোট ছিল। এই নোটে বলা হয়েছিল, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনে ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
তবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভিন্নমতের বিষয়গুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি এখন ওই আদেশকে অবৈধ বলছে।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল জানিয়েছেন, যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে, সেখানে বিএনপির ইশতেহার প্রাধান্য পাবে। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদেই ওটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনী ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেইটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার কোনটা মানা উচিত সেটা জুলাই সনদেই বলে দেওয়া আছে। এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।’
সেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৫ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি ‘তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ হিসেবে কাজ করবে।
এই কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধিত দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা পদে উপযুক্ত একজন করে ব্যক্তির নাম দিতে পারবে।

















