কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা কবিতায় এক নতুন ভূগোল ও কাব্য ভাষার জন্ম দিয়েছেন। তিনি কেবল ভূ-প্রকৃতি নয়, বরং মানুষের জীবন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, বেদনা ও স্বপ্নকেও তাঁর কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, কোনো ভূগোলই মানুষের অস্তিত্ব, উপস্থিতি এবং তাদের জীবনযাত্রা ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর কবিতায় শহুরে ও গ্রামীণ মানুষের জীবন, তাদের জীবনাচরণ, ভাষা, আচার-আচরণ, ভাব ও ভালোবাসার ভিন্নতা এবং বৈষম্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গ্রামে ৯৬ শতাংশ লোডশেডিংয়ের মতো বঞ্চনা দেখা যায়, যা নিয়ে গ্রামের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করলেও শহরের মানুষ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় তাদের সন্তুষ্টির প্রয়োজন হয়। এই বঞ্চনার উদাহরণগুলো তিনি তাঁর কাব্যে এঁকেছেন।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মানুষের হাড়, মাংস, জিহ্বার ভাষা, বানান ও উচ্চারণ নিয়ে এক নতুন কাব্য পরিসর ও কাব্য ভাষার জন্ম দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলা ভাষার বানানকে সংস্কৃত ব্যাকরণের কঠোর নিয়মে আবদ্ধ না রেখে এর প্রকৃত উচ্চারণ ও স্বাভাবিক ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মূর্ধন্য ‘ণ’-এর পরিবর্তে ‘ন’, দীর্ঘ ‘ঈ’ ও ‘ঊ’-এর পরিবর্তে ‘ই’ ও ‘উ’, অনুচ্চারিত ‘য’-ফলা ও বিসর্গ বর্জনসহ একাধিক বানানগত পরিবর্তন গ্রহণ করেন। কোথাও কোথাও তিনি ‘স’-এর পরিবর্তে ‘শ’, ‘ঙ’-এর পরিবর্তে অনুস্বার (ং) এবং অসমাপিকা ক্রিয়ায় নিজস্ব রীতিতে ‘ো’-কার বা লোপচিহ্ন ব্যবহার করেছেন। তাঁর এই বানানরীতি বাংলা বানানকে আরও সহজ, উচ্চারণনির্ভর ও প্রাণবন্ত করে তোলার একটি সচেতন প্রচেষ্টা ছিল।
১৯৭১ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকে বিশ্বসাহিত্যে আধুনিক কাব্যের বহু অমর সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিরোধ, ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, জাতীয় পরিচয়, ব্যক্তিস্বীকারোক্তিমূলক অভিজ্ঞতা এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিষয়গুলো কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে মায়া অ্যাঞ্জেলু, সিমাস হিনি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট কবিদের বহু কালজয়ী রচনা প্রকাশিত হয়। মায়া অ্যাঞ্জেলুর ‘Still I Rise’ (১৯৭৮) কবিতাটি আত্মমর্যাদা ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার শক্তির প্রতীক। অ্যাড্রিয়েন রিচ-এর ‘Diving Into the Wreck’ (১৯৭৩) কবিতায় নিঃসঙ্গতা, আত্ম-অনুসন্ধান এবং নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস পাঠের প্রয়াস দেখা যায়। জন অ্যাশবেরির ‘Self-Portrait in a convex Mirror’ (১৯৭৫) শিল্প, উপলব্ধি এবং আত্মপরিচয়ের জটিল সম্পর্ক নিয়ে রচিত। নোবেলজয়ী আইরিশ কবি সিমাস হিনি তাঁর ‘Station Island’ (১৯৮৪) কাব্যগ্রন্থে নিজের অতীত এবং রাজনৈতিক শহীদদের আত্মার মুখোমুখি হন। গ্যালওয়ে কিনেলের ‘The Book of Nightmares’ (১৯৭১) মৃত্যু, প্রজন্মগত ক্ষত এবং মানবজীবনের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শামসুর রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত এবং এতে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ ও ‘স্বাধীনতা তুমি’-এর মতো কালজয়ী কবিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘Stay Away from Me, Bangladesh – I’ (১৯৭১) কবিতায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের চিত্র ফুটে উঠেছে। এ. কে. রামানুজনের ‘Selected Poems’ (১৯৭৬) আধুনিক ভারতীয় নগরজীবন এবং প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের টানাপোড়েনকে প্রকাশ করে। কানাডীয় কবি বিল বিসেট-এর ‘Nobody Owns the Earth’ (১৯৭২) গ্রন্থে যুদ্ধবিরোধিতা, পরিবেশ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং মানবতাবাদী দর্শন প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নিজেকে ‘শব্দ-শ্রমিক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “আমি কবি নই— শব্দ-শ্রমিক। শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়, হৃদয়ের কালো বেদনায়। করি পাথরের মতো চূর্নছিঁড়ি পরান সে ভুলে পূর্ন। রক্তের পথে রক্ত বিছিয়ে প্রতিরোধ করি পরাজয়, হাতুড়ি পেটাই চেতনায়।” তিনি মাটিতে লেগে থাকা রক্তের দাগ ভোলেননি, তাই উচ্চারণ করেছেন: “মাটিতে রক্তের দাগ— চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়। এ-চোখে ঘুম আসে না। সারারাত আমার ঘুম আসে না।” তাঁর ‘মানুষের মানচিত্র-৩২’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “না-ভুখা দুনিয়ায় জুলুম চালায় যারা কেড়ে নেবো তাগো সব সুখের খোয়াব।” ‘বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা, ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ কবিতায় তিনি মেঘের জরায়ু ছিঁড়ে জলের শিশুর জন্মের চিৎকারে ভুবন ভরে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।

















