চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবদুর রব হলের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের (১৯) কক্ষে এখন কেবলই শূন্যতা। তাঁর পড়ার টেবিলজুড়ে পড়ে আছে অগোছালো বই, একটি বইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা ব্যবহারিক খাতায় আঁকা ২০টি চিত্র, আর পাশে রাখা স্বর্ণপদক ও নানা স্মারক। বিছানার ওপর পড়ে থাকা চিপসের প্যাকেটটি তিনি টিউশনি থেকে ফেরার পথে কিনে এনেছিলেন, যা আর খাওয়া হয়নি তাঁর। মঙ্গলবার রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারানো আরিফুল ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবদুর রব হলের মূল ফটকের পাশে একটি ছোট কক্ষের ওপর উঠে ব্যানার লাগাচ্ছিলেন আরিফুল। এ সময় তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরের এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আরিফুল শহীদ ফরহাদ হোসেন হলের ২৩৬ নম্বর কক্ষে থাকতেন।
আরিফুলের অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সহপাঠীদের মাঝে। তাঁর সহপাঠী বিশাল হোসাইন বলেন, আরিফুল তাদের ব্যাচের নয়নমণি ছিলেন। বিভাগের অনুষ্ঠান, আড্ডা কিংবা খেলাধুলা—সবখানেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। তিনি আরও জানান, আরিফুল অত্যন্ত মেধাবী ও প্রাণচঞ্চল ছিলেন। খেলাধুলায়ও তিনি সমান দক্ষ ছিলেন; চলতি বছর শহীদ আবদুর রব হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার দৌড়ে প্রথম ও ৫০০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক এবং আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি।
তাঁর রুমমেট জহিরুল হক জানান, আরিফুলকে তিনি ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। টিউশনি থেকে ফিরে আরিফুল তাঁর ব্যবহারিক খাতাটি জহিরুলকে দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরীক্ষার ব্যস্ততায় তা আর দেখা হয়নি। জহিরুল বলেন, এখন আরিফুল কেবলই একটি স্মৃতি হয়ে রইলেন। আরিফুলের বাবা মোহাম্মদ মনসুর আলী পেশায় একজন কৃষক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আরিফুল নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে সপ্তাহে পাঁচ দিন শহরে টিউশনি করতেন। অত্যন্ত মিতব্যয়ী আরিফুল নিজের খাবারের খরচ কমিয়ে চলতেন বলেও জানান সহপাঠীরা। তাঁর চাচাতো ভাই মো. ইলিয়াস জানান, গত শুক্রবারও আরিফুলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল, যা ছিল জীবনের শেষ আলাপ।

















