রাজধানীর বঙ্গবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়ক কার্যত বাসের পার্কিংয়ে পরিণত হওয়ায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে পুলিশের উদাসীনতা এবং সড়কের জায়গা দখল করে লাইনম্যানদের চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল দ্রুত কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ৩১ আগস্ট দুপুরে বঙ্গবাজার মোড়ে তীব্র যানজটে আটকে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজীর হোসাইন সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাস পার্কিং দেখে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে প্রশ্ন করেন। জবাবে পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আমরা পারি না, আপনি একটু বাইক থেকে নাইম্যা বাসগুলো সরায়া দ্যান।’ এই ঘটনায় তানজীর হোসাইন হতাশ হয়ে প্রথম আলোকে জানান, সড়কে বাস পার্কিংয়ের কারণে যানজট তৈরি হলেও পুলিশ এ বিষয়ে গা-ছাড়া বক্তব্য দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বঙ্গবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বাস পার্কিংয়ের কারণে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুরে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের নিচে এই ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশের লেনে অন্তত ৭৪টি বাস পার্কিং করা ছিল। শুধু বাস দাঁড়িয়ে থাকাই নয়, স্থানীয়ভাবে পরিচিত লাইনম্যানরা বাস পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁদের বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাস পার্কিংয়ের জন্য দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
বেসরকারি সংস্থার কর্মী শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাস পার্কিংয়ের লাইনম্যান খাইরুলের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে গুলিস্তান মোড়ের সামনে। শাহাদাত জানান, মোটরসাইকেল রেখে টয়লেটে যাওয়ার পর ফিরে এলে খাইরুল ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরেকজন খারাপ ব্যবহার করে এবং বাইক রাখার জন্য টাকা দাবি করে। পরিচয় দেওয়ার পর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাঁরা বলেন, ‘এটা আমাদের বাস পার্কিংয়ের জায়গা।’ শাহাদাত প্রশ্ন তোলেন, ব্যস্ত সড়কের জায়গা কীভাবে একটি গোষ্ঠী নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ব্যবহার করে, আর তা দেখার কেউ থাকে না?
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনায় যানজটের চাপ বাড়ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী, যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। ফুলবাড়িয়ার জাকের সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী হায়দার আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের মার্কেটে কাপড় কিনতে আসেন। কিন্তু মার্কেটের সামনের সড়কে বাস পার্কিং করে রাখায় যানজট তৈরি হয়, যা ক্রেতা ও তাঁদের উভয়ের জন্যই সমস্যা। তিনি এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি বলে মনে করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের (ট্রাফিক) অতিরিক্ত কমিশনার এহসানুল কামরান তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, বাস পার্কিংয়ের কারণে এই এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। মাঝে ডিসি স্যার এটা বন্ধ করেছিলেন, তবে আবার বাস পার্কিং শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই এলাকার বাস টার্মিনাল আগামী চার মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার নির্দেশ দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে সমস্যার সমাধান হবে।
উল্লেখ্য, ঢাকার যানজট কমাতে গত ১৫ জুন এবং পরে ২৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তানসহ চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন–সংক্রান্ত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় আগামী চার মাসের মধ্যে ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে একটি অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি দলকে ১৫ দিনের সময়ও দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, টার্মিনাল সরানো গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে বাস ও আন্তজেলা যানবাহনের চাপ কমবে এবং যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে।
গুলিস্তান শুধু একটি বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এলাকা নয়, এটি রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৭ জেলার মানুষ যাতায়াত করেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান এলাকা থেকে এই অঞ্চলের বাসের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে গুলিস্তান পাইকারি পণ্যের বড় বাজার হওয়ায় ব্যবসায়ীদের চাপও বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এলাকাটিতে যাত্রীর চাপের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে সড়কের দুই পাশে বাস পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

















