‘আপনারা কি কেউ দেখেছেন আমার মেয়েকে? এক বছর ধরে আমার মেয়ে নিখোঁজ। খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা আমার সন্তানকে খুঁজে দিন। গ্রামে আমার একটা ভিটেবাড়ি আছে। কেউ আমার মেয়েকে এনে দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে ওই ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব।’ ডায়াসে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন নিখোঁজ শিশু রূপা আক্তারের মা স্বপ্না আক্তার।
নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে ও জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বপ্না আক্তারের মতো আরও ৪০টি পরিবারের মা-বাবা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের কথা বলতে এসেছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে ছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ছবিসহ প্ল্যাকার্ড। কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘৩৭০ দিন’ বা ‘৮ দিন’ ধরে নিখোঁজ, আবার কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘৬,৫৫৩ দিন’ ধরে নিখোঁজ। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাঁদের হারানো সন্তানদের খুঁজে দেওয়ার আহ্বান জানান।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের অভিযোগে জিডি হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে, বাকিদের উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বপ্না আক্তার জানান, তিনি স্বামী, দুই সন্তানসহ রাজধানীর পল্লবীতে থাকেন। স্বামী মো. রাজন ভ্যানে করে শিশুদের খেলনা বিক্রি করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট বাসার কাছে দোকানের সামনে থেকে তাঁর তিন বছর বয়সী মেয়ে রূপা নিখোঁজ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক তরুণ রূপাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও এক বছরের বেশি সময় পার হলেও মেয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি। স্বপ্না বলেন, ‘মেয়ে বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে সেটাও জানি না। কিন্তু মেয়েকে পাওয়ার আশা একমুহূর্ত ছাড়তে পারি না। আপনারা আমাদের ভিডিওগুলো শেয়ার করুন, আমাদের সন্তানদের খুঁজে দিন। মৃত্যুর আগে একবার হলেও সন্তানকে দেখে যেতে চাই।’
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার সরিষা প্রেমটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. তামিম ওরফে আবদুল্লাহ (১৫) গত বছরের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি। তার বাবা মো. নজরুল ইসলাম, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল, জানান, তাঁর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে তামিম ছোট। বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত খুঁজেও ছেলের সন্ধান পাননি তিনি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় কবিরাজ থেকে শুরু করে ‘জিন নামায়’ এমন ব্যক্তির কাছেও গিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সবার কাছে অনুরোধ, আমার যা কিছু আছে সব দিয়ে দেব। আমি রাস্তায় নেমে যাব। আমি আমার সন্তানকে চাই।’
তহুরা ইসলাম জানান, তাঁর ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ১ মাস ২০ দিন হয়েছে। তিনি নবাবগঞ্জের দোহায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাসার একটি কক্ষে দুই বছরের সন্তান মো. তোহা আদনানকে মুঠোফোন দিয়ে অন্য কক্ষে যেতেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। বিছানায় মুঠোফোন পড়ে ছিল। থানায় জিডি করেছেন তিনি।
লামিয়া নামের একটি শিশুকে কোলে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মো. সবুজ মিয়া ও চম্পা বেগম (২৫)। চম্পা বেগম জানান, তাঁর যমজ মেয়ে সামিয়া আড়াই বছর আগে বাড়ির সামনে খেলতে থাকা অবস্থায় নিখোঁজ হয়েছে। তিনি প্রতিবেশী এক ব্যক্তিকে আসামি করে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। মাত্র তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি, কিন্তু সামিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। চম্পা আরও জানান, ছয় মাস আগে টিকটকে একটি শিশুকে নিয়ে কনটেন্ট দেখতে পান। তিনি দাবি করেন, ওই শিশুটি তাঁর হারিয়ে যাওয়া সামিয়া। শিশুটি যশোরে একটি পরিবারে আছে জেনে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশের কোনো সহযোগিতা পাননি। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটি তাঁর নয়।
চাঁদপুরের শিশু খাদিজা (৬) ও ধামরাইয়ের শিশু গনেশ (৫) পাশের বাড়িতে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। খাদিজা ১ হাজার ৯৭৪ দিন এবং গনেশ ৩৩৩ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে।
দিনাজপুরের মনিরুজ্জামান মনি মুক্তিপণের টাকা নিয়েও তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে মানতাশাকে উদ্ধার করতে পারেননি। গত বছরের মে মাসে বাসার সামনে থেকে তাঁর সন্তান নিখোঁজ হয়। মেয়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি আকুল হয়ে কাঁদছিলেন।
এক বছর পর হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজে পেয়েছেন এমন এক বাবা, আজাদ রহমান, অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কর্মস্থলে পূর্বশত্রুতার জেরে গত বছরের জুলাই মাসে তাঁর সাত বছর বয়সী মেয়ে আশফিয়াকে টঙ্গীতে বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয়। মেয়ের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, তাকে পপকর্ন খাইয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। সে বাড়ির কথা কিছু মনে করতে পারেনি। সন্তানের শোকে পাঁচ মাস পর তাঁর স্ত্রী শামসুন্নাহার মারা যান। গত মাসে পুলিশের মাধ্যমে আজাদ তাঁর মেয়েকে পুবাইলে একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে খুঁজে পান।
জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান জানান, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এক লাখ মানুষের পিটিশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে অ্যাম্বার অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহযোগিতায় এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন (মুন অ্যালার্ট) এবং টোল হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর পাইলট কার্যক্রম চালু করা হয়, যা বর্তমানে দেশব্যাপী শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে সহায়ক একটি উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা ঘটনাগুলোর পুনঃ তদন্ত ও অগ্রগতি পর্যালোচনা, শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
পুলিশের মাধ্যমে গত মাসে আজাদ তাঁর মেয়েকে খুঁজে পান পুবাইলে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে।.পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি, ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি।

















