কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের পাশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) কোরাল বিচ রিসোর্ট নামের একটি নতুন স্থাপনা গড়ে উঠছে। সম্প্রতি আগুনে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট থেকে মাত্র এক মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত এই রিসোর্টটিতেও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বা প্রয়োজনীয় কোনো সনদ পাওয়া যায়নি। গতকাল রোববার দুপুরে সরেজমিনে রিসোর্টটিতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ১০ বিঘা জমিতে দোতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তালুকদার জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে এবং ধাপে ধাপে সব সনদ সংগ্রহ করা হবে।
গত শনিবার সকালে ভয়াবহ আগুনে টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য ছিলেন। এই ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং রিসোর্ট নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর টুপটুপ রিসোর্ট বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) দুই দফা ভেঙে ফেলার নোটিশ দিয়েছিল এবং ফায়ার সার্ভিস ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সতর্ক করেছিল। তা সত্ত্বেও, অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়াই রিসোর্টটি ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছিল।
টুপটুপে প্রাণহানির পরদিন গতকাল দিনভর মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনুমোদন ছাড়াই নতুন রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ এবং অতিথি কক্ষ তৈরির কাজ চলছে। এমনকি শহরের আটতলা হোটেলও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা অনিয়ম চিহ্নিত করে নোটিশ দিলেও নির্মাণ ও ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না।
সরকারি সংস্থা, হোটেলমালিক সমিতি ও ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিনিরোধ ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন অনিয়ম রয়েছে। হোটেলমালিকদের হিসাব মতে, বছরে প্রায় ৯০ লাখ পর্যটক কক্সবাজার আসেন, যাদের জন্য পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ, প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ এবং নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। টুপটুপের ঘটনা সরকারি তদারকির ব্যর্থতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট করেছে।
অনুসন্ধানে সংগৃহীত তথ্যানুসারে, ২০০০ সালে কক্সবাজারে দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট ছিল, যা ২০১০ সালে ৫০০ এবং ২০২০ সালে ১০০০ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে জেলায় দুই হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। গত আড়াই দশকে পর্যটকদের থাকার স্থাপনার সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু কক্সবাজার শহরে প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫৩৭টি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। শহরের বাইরেও মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফে ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় প্রায় ৬০টি নতুন রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে।
পর্যটন ব্যবসার এই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মাত্র ১১৫টি হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ এবং ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। এর বাইরে কত প্রতিষ্ঠান এসব ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে, তার কোনো সমন্বিত তালিকা সরকারি দপ্তরগুলোতে নেই। কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে প্রায় ২৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। তারকা মানের কয়েকটি ছাড়া অন্যগুলোর বৈধ অনুমোদন নেই।
মেরিন ড্রাইভের সোনারপাড়া এলাকায় বাঁশ ও বেত দিয়ে ছয়টি কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে, যদিও সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্ণধার ইমরান নাজির নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে জানান, অগ্নিনিরাপত্তা সনদের জন্য আবেদন করেছেন এবং অন্য অনুমোদনের কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন। পাটুয়ারটেকের সেইলর বিচ রিসোর্টে প্রায় এক বছর আগে নির্মিত ১৫টি কক্ষে ৩০ জনের বেশি পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবস্থাপক মামুন হোসেন জানান, অনুমোদনের জন্য সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। এর থেকে বোঝা যায়, উদ্যোক্তারা ভবন নির্মাণের আগে অনুমোদন নেওয়ার পরিবর্তে পরে দপ্তরে যোগাযোগ করছেন।
হোটেল-রিসোর্টের ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও নির্মাণের অনুমোদন, ব্যবসা পরিচালনার নিবন্ধন ও লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন আলাদা বিষয়। একটি সংস্থার কাগজ দিয়ে অন্য সংস্থার অনুমোদনের ঘাটতি পূরণ হয় না। এছাড়া, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) জমির ব্যবহার ও নির্মাণের বিধিনিষেধও মানতে হয়।
কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় আটতলা হোটেল কক্স রোটানার অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিকল্পনা নেই বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে এবং সম্প্রতি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরও জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। হোটেলের কর্ণধার মো. ফরিদ দুবাইয়ে থাকেন এবং স্থানীয় সাংবাদিক এম আর মাহবুব এটি দেখভাল করেন। মাহবুবের দাবি, সব নিয়ম মেনেই হোটেল চলছে এবং সব কাগজপত্র রয়েছে, যদিও কর্মচারীরা তা দেখাতে পারেননি।
ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হোটেল সি সোর, আরহাম রিসোর্ট এবং মডার্ন রিসোর্টেরও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। পার্ল এভিনিউরও ফায়ার লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা নেই। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ দেওয়ার মাধ্যমে সংস্থাগুলো ঘাটতি চিহ্নিত করছে, কিন্তু তা দূর হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার আগেই ব্যবসা চলছে। টুপটুপের ক্ষেত্রেও একাধিক সংস্থার নোটিশ সত্ত্বেও পর্যটক গ্রহণ বন্ধ হয়নি।
কক্সবাজার জেলায় তিনটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) রয়েছে: কক্সবাজার–টেকনাফ সমুদ্রসৈকত এলাকা, সোনাদিয়া ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এসব এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। মেরিন ড্রাইভের ইসিএভুক্ত এলাকায় মো. তানভিরুল নামের এক ব্যক্তি চারটি কটেজ নির্মাণ করছেন। নির্মাণকাজে নিয়োজিত রবিউল হাসান জানান, তিন মাস আগে কাজ শুরু হয়েছে এবং আরও দুই মাস লাগবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ইসিএভুক্ত জমির শ্রেণি পরিবর্তনে পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মতি বাধ্যতামূলক।
কউক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানান, প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে নির্মাণে বিধিনিষেধ থাকায় কউক অনুমোদন দিতে পারছে না, তবুও স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও স্থাপনা সরেজমিনে দেখে তালিকা করা হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, কক্সবাজারে ইসিএভুক্ত এলাকায় হোটেল-কটেজ নির্মাণের কোনো সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না। তিনি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যাচাই এবং সনদ না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিলগালা করার ওপর জোর দেন।
সেন্ট মার্টিনে ২৩৪টি হোটেল–রিসোর্ট গড়ে উঠেছে এবং সেখানেও আইন ভেঙে স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিলেও নতুন নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, নিয়ম না মেনে ইসিএভুক্ত এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ হচ্ছে, যদিও তারা জরিমানা, নোটিশ ও মামলা করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর গত এক বছরে ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে। এর মধ্যে জিডি সমুদ্রবিলাসকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, হোটেল কল্লোলকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, টাইটান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সী পার্ল বীচ রিসোর্টকে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। একই ধরনের অনিয়মে শতাধিক রিসোর্টের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সেন্ট মার্টিনের আটটি মামলা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এই জরিমানা, নোটিশ ও মামলা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
কউক চেয়ারম্যান জানান, ২০১৬ সাল থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি ভবন নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে পাঁচ শ হোটেল-রিসোর্ট ও গেস্টহাউস ভবন রয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান দাবি করেন, অতীতে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা হোটেল–রিসোর্টের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং গত দুই সপ্তাহে শহরে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। কক্সবাজার হোটেল–গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, তাঁর সমিতির সদস্য ১৮৭টি হোটেলের প্রায় সবগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)–এর কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী মনে করেন, কউক, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতিতেই একের পর এক বেআইনি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে এবং এখনো নির্মাণ চলছে।
এদিকে, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। প্রধান আসামি করা হয়েছে মালিক মো. তানভীরকে। গত শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখসহ ১৯ জন অজ্ঞাতনামা আসামি। ঘটনার দিন বিকেলে আটক রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা এলেও মরদেহ বুঝে পাচ্ছেন না। আগুনে চেহারা বিকৃত হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও কোনটি কার মরদেহ, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রিসোর্টে থাকা নাসরিন আক্তার নামের এক শিক্ষিকার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল জানান, হাসপাতালে লাশের যে অবস্থা, তাতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন এবং ডিএনএ টেস্ট লাগবে।
প্রতি মাসে ৫০ থেকে ১০০টি আবেদন জমা পড়ছে।

















