ইসলামের অনুপম শিক্ষা ও সৌন্দর্য হলো সুন্দরভাবে কথা বলা। সঠিক ও মার্জিত ভাষায় কথা বলে সহজেই অন্যকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা যায়, আবার স্থান-কাল-পাত্রভেদে কথা বলার ভুল পদ্ধতির কারণে মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। কথা এমন একটি বিষয়, যা মুখ থেকে একবার বের হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে (তিরমিজি: ২৬২৭)।
ইসলামে মিথ্যাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার মানুষ তো বটেই, আসমানের অধিবাসীরাও ঘৃণা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন তার মুখ থেকে নির্গত মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা তার থেকে এক মাইল দূরে সরে যায় (তিরমিজি: ১৯৭২)। তাই সবসময় সত্য কথা বলা বাঞ্ছনীয়। এছাড়া যেকোনো কথা বলার আগে চিন্তা করা জরুরি। দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো কল্যাণ নেই—এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে, যা সুরা কাফের ১৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কথা বলার সময় তাড়াহুড়া করা দোষণীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ধীরে ধীরে কথা বলতেন, যাতে শ্রোতারা সহজেই বুঝতে পারে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল (সা.)-এর কথা বলার ধরন এমন ছিল যে কেউ চাইলে তা গুনে রাখতে পারত (মুসলিম: ৭৩৯৯)। কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রেও ইসলাম মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। সুরা লুকমানের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কথা বলার সময় আওয়াজ নিচু রাখা এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।
মানুষের সঙ্গে উত্তমভাবে কথা বলা ইসলামের সৌন্দর্য, যার নির্দেশ পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৮৩ নম্বর আয়াতে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাসুল (সা.)-এর সামনে আওয়াজ উঁচু করার ব্যাপারে সুরা হুজুরাতে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করার সময় হিকমত ও সুন্দর উপদেশের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সুরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে।
মন্দ কথার প্রতিবাদ করতে হলে তা ভালোর মাধ্যমে করতে হবে, কারণ ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। সুরা হামিম আস-সাজদার ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মন্দকে উৎকৃষ্টতর বিষয় দিয়ে প্রতিহত করলে শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়। সবশেষে, অজ্ঞ বা মূর্খ লোকদের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে তাদের এড়িয়ে চলা মুমিনের গুণ। সুরা ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, রহমানের বান্দারা অজ্ঞ লোকদের সম্বোধনের জবাবে নম্রভাবে কেবল ‘সালাম’ বলে থাকে।
সতর্কতা : পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চস্বরে কথা বল, তার সঙ্গে তেমন উচ্চস্বরে কথা বলো না। এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর রাসুলের কাছে নিজেদের আওয়াজ অবনমিত করে, আল্লাহ তাদেরই অন্তরগুলো তাকওয়ার জন্য বাছাই করেছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।' (সুরা হুজুরাত : ২-৩)।

















