মানুষের মন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই একে নিয়মিত শিক্ষা, শুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস’ (সুরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)। মানুষের হৃদয় পরিবর্তনের বিষয়ে মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে বলতেন, আদম সন্তানের হৃদয় ফুটন্ত হাঁড়ির পানির মতো ঘনঘন পরিবর্তিত হয়। উম্মে সালামা (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, আল্লাহর রাসুল (সা.) নিয়মিত দোয়া করতেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।’ যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি জানালেন মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে, যাকে তিনি ইচ্ছা দৃঢ় রাখেন বা পথভ্রষ্ট করেন (তিরমিজি : ৩৫২২)।
জীবনের অন্যতম বড় বিপদ হলো গাফলত বা অলসতা ও উদাসীনতা। এই প্রবণতা মানুষের মূল্যবান সময় ও শক্তি নষ্ট করে, হৃদয়কে মৃতপ্রায় করে ফেলে এবং কল্যাণকর কাজ থেকে বঞ্চিত রাখে। গাফলত মানেই দায়িত্বহীনতা, যেখানে মানুষ আল্লাহকে ভয় করা বা ইবাদত করার মূল উদ্দেশ্য ভুলে যায়। আল্লাহতায়ালা সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের মধ্যে অনেকেই তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে গাফিল। এছাড়াও সুরা রুমের ৬-৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষ পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানলেও আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন এবং তারা আল্লাহর সাক্ষাতের বিষয়ে অবিশ্বাসী।
শয়তানের কুমন্ত্রণা মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। যদি কেউ বারবার গাফলতিতে ডুবে থাকে, তবে তা বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাওবা করা এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় চাওয়া জরুরি। সুরা আরাফের ২০০-২০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, শয়তানের কুমন্ত্রণা পেলে যেন তাঁর শরণাপন্ন হওয়া হয়, কারণ যারা তাকওয়ার অধিকারী, তারা আল্লাহকে স্মরণ করার সাথে সাথেই সচেতন হয়ে ওঠে।
গাফলতির অন্যতম কারণ হলো আখেরাতের প্রস্তুতির অভাব এবং অহেতুক সময় নষ্ট করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) সুস্থতা ও অবসরকে এমন দুটি নিয়ামত বলেছেন, যার ব্যাপারে মানুষ প্রতারিত হয় (বোখারি : ৬৪১২)। এছাড়া কিয়ামতের দিন যৌবন ও জীবন কোথায় ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে (তিরমিজি : ২৪১৬)। গাফিল লোকদের সাহচর্য এড়িয়ে চলাই শ্রেয়, কারণ মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। সুরা কাহফের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যারা খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী, তাদের আনুগত্য না করতে।
বর্তমান যুগে মোবাইল, টিভি ও ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার গাফলতির একটি বড় দরজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ সময় নষ্ট করে এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, যার ফলে কুরআন পাঠ বা জ্ঞানচর্চার সুযোগ কমে যায়। সুরা আম্বিয়ার ১-৩ নম্বর আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে যে, মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে এবং উপদেশ শুনলে কৌতুক করছে। তাই সময় থাকতেই এই গাফলতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
গাফলতের অন্যতম কারণ হলো আল্লাহর ভয় না থাকা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি না নেওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'নিশ্চয়ই যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না ও পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট আর এতেই পরিতৃপ্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে গাফিল। এদেরই আবাস দোজখ, এদের কৃতকর্মের জন্যে।' (সুরা ইউনুস : ৭-৮)।

















