ভারতে শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার সেই তুলনায় অত্যন্ত ধীর। দেশটিতে বর্তমানে স্নাতকদের বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরও বিপুল সংখ্যক তরুণ তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
এই সংকটের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান বড় ধরনের ব্যবধান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ স্নাতক তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত পেশায় কাজ করছেন। এর ফলে অধিকাংশ তরুণ হয় তাদের দক্ষতার তুলনায় নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, অথবা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে নতুন করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সময় ব্যয় করছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, ভারতের শ্রমবাজারের কাঠামোও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কৃষি খাত থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও ভালো আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। উৎপাদন খাত মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১২ থেকে ১৪ শতাংশ জোগান দিচ্ছে, আর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক বা অসংগঠিত খাতে কাজ করছেন। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষিত ও কমশিক্ষিত বেকারদের মধ্যে মানসিকতার পার্থক্যও এখানে লক্ষণীয়। কমশিক্ষিতরা দ্রুত আয়ের সন্ধানে যে কোনো কাজ গ্রহণ করলেও, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো চাকরির জন্য অপেক্ষা করেন, যা পরিসংখ্যানগতভাবে বেকারত্বের হার বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘অভিজ্ঞতার ফাঁদ’ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের একটি ফ্রেশার হায়ারিং জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭২ শতাংশ চাকরিপ্রার্থী জানিয়েছেন যে এন্ট্রি-লেভেল চাকরিতেও পূর্ব অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, অথচ পড়াশোনার সময় মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী অর্থপ্রাপ্ত ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে শিক্ষাগত অর্জনের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চ ও মধ্যম দক্ষতার উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি হয়নি। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থানের অংশ ১১-১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় শুধু দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এছাড়া গবেষণায় বিনিয়োগের স্বল্পতাও একটি বড় কারণ। ‘ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত জিডিপির মাত্র ০.৬৪-০.৬৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৩.৪৮ শতাংশ এবং চীনে ২.৪৩ শতাংশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের যুগে নিয়োগকর্তারা প্রথাগত ডিগ্রির চেয়ে বাস্তব দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাক্রমকে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে আধুনিকায়ন করা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইন্টার্নশিপ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তব প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। নীতি আয়োগও বিশেষায়িত ও চাকরিমুখী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের দুর্বল বিনিয়োগও এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। ‘ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬’-এর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ভারত জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৬৪–০.৬৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৩.৪৮ শতাংশ, চীনে ২.৪৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪.৯১ শতাংশ। গবেষণা ও উদ্ভাবনে কম বিনিয়োগের ফলে উচ্চ দক্ষতার জ্ঞানভিত্তিক শিল্প ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

















