অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তখন দেশটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তবে সেই কঠিন সময়ে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশা ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল জাতীয় ঐক্য। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলনের ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান। সেই আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি বিষয়—জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। সব মিলিয়ে মানুষ একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিল।
ইতিহাস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির খতিয়ান নির্মোহভাবে করবে। তবে এটি সত্য যে, তারা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর চেয়ে আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। তাদের অভিজাততান্ত্রিক ভাবনার কারণে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি আরও গভীর করা সম্ভব হয়নি। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা নিয়ন্ত্রণে আনা এবং নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর তাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন, তবুও জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করার বদলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলানির্ভরতা তাদের বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জুলাইয়ের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে গুটিকয় প্রশাসনিক শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। পরিবর্তনের বিস্তৃত সামাজিক ধারণাটি কেবল ‘সংস্কার’ শব্দের মধ্যে আটকে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে যমুনার ঘেরাটোপে সীমাবদ্ধ ছিল। এছাড়া আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক এবং তরুণদের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে তাদের সামনে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতা ফেরানোর বাইরে কর্মসংস্থান বা বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে অন্তরালে থেকে গিয়েছিল।
বর্তমানে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। যদিও তাদের শাসনকালের মাত্র কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে, তবুও সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে স্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি সত্যিই আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য নিয়োগ ও পদায়নের মান, শিক্ষা খাতের অরাজকতা এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষা নিয়ে যে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২-এর ঘরে নেমে আসা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অভাব বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে সব পরিবর্তন রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী নয়; নাগরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমেও অনেক পরিবর্তন সম্ভব। জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র পরিবর্তন। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের। হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, কে সফল বা ব্যর্থ—এই সংকীর্ণ প্রশ্নে আটকে না থেকে জুলাইয়ের সামাজিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় পাথেয়।

















