চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর দৃশ্যপট অনেকখানি পাল্টালেও, এলাকাটি এখনো পুরোপুরি প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি ও দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প থাকলেও, কিন্তু গত ৪ আগস্ট সরেজমিন দেখা গেল, বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন চালানো বিদ্যুৎ ও পানির বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবাগুলো এখনো স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। গত মাসের বিভিন্ন সময়ে আলীনগরের ১৫ বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।
এম এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের দোকানদার শাহ আলম জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি কোনো সরকারি বিদ্যুৎ বিল পাননি। স্থানীয় ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’-এর রসিদে তিনি টাকা জমা দেন এবং এলাকাটিতে তাদের আলাদা বিদ্যুৎ অফিসও রয়েছে। বকেয়ার কারণে জুলাইয়ে টানা ১৫ দিন এলাকার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কর্তৃপক্ষ জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে মাত্র ২২টি বৈধ সংযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে অসংখ্য অবৈধ সাবলাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হচ্ছে। এই সংযোগগুলোর বিপরীতে প্রায় ৭২ লাখ টাকা বকেয়া ছিল, যার মধ্যে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং বাকি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ জানান, সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে পুলিশ ক্যাম্প ও সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হবে, তাই যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
পানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই অব্যবস্থাপনা বিরাজমান। বিভিন্ন গভীর নলকূপ ও পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হলেও এর কোনো সমন্বিত হিসাব নেই। গত ২৬ জুলাই আলীনগরে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির পাইপলাইনে বিষাক্ত পদার্থ মেশানোর ঘটনা ঘটে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। পুলিশ এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছে এবং জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে বলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী জানিয়েছেন।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে ৩ হাজার ১৭৩ জন সদস্য অংশ নিয়েছিল, যেখানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার ও প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে এলাকাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও, ২৪ মে রাতে আলীনগরের ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা ও রাস্তা কেটে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মো. ইয়াসিন ও তাঁর সহযোগীরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত তারা আতঙ্কে আছেন। পাশাপাশি, সরকারি জমির হিসাব নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে; ২০২২ সালে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা বলা হলেও বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার হিসাবে তা প্রায় ১ হাজার একর। পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট করা হয়েছে। আলীনগরে আড়াই কাঠার একেকটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং ছোট প্লট প্রায় ৫ লাখ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের ২৩ হাজারই বিক্রি হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য এবং সেই ক্রেতাদের বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় বিদ্যুৎ-পানি সেবার গ্রাহক বানানোর মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থ আদায়ের কাঠামো সেখানে গড়ে উঠেছে।

















