ভৈরবের সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা প্রমাণ করে যে কীভাবে তুচ্ছ স্থানীয় বিরোধ জাতীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত দেড় মাসে ফুটবল খেলা, মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং একটি বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে তিনটি বড় সংঘর্ষ ঘটেছে। এই ঘটনাগুলোর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে এক দিন টানা ছয় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। আরেক দিন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরুদ্ধ ছিল এবং তৃতীয় ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। পাড়াভিত্তিক এসব সংঘর্ষের প্রভাব এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মহাসড়ক ও রেললাইনে ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের ভোগান্তি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করছে।
ভৈরব পৌরসভার পঞ্চবটি ও জগন্নাথপুর এলাকার তরুণদের মধ্যে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটি থেকে ৪ জুন রেলস্টেশনে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর ফলে প্রায় ছয় ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-নোয়াখালী রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশের ছয় সদস্য আহত হওয়ার পাশাপাশি রেলস্টেশনের ১৫টি দোকান লুট ও ভাঙচুর করা হয়, যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। ওইদিন ভৈরবসহ আশপাশের স্টেশনে আটকা পড়েছিলেন মহানগর গোধূলী, পারাবত এক্সপ্রেস, এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেসসহ ১০ থেকে ১২টি ট্রেনের ৭–৮ হাজার যাত্রী। ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুসা শেখ জানান, এসব সংঘর্ষের বেশির ভাগই আকস্মিকভাবে শুরু হয় এবং আগাম তথ্য না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
১০ জুন ভৈরবপুর ও কমলপুর এলাকার লোকজনের মধ্যে মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের দখল নিয়ে সংঘর্ষ হয়। সন্ধ্যা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-সিলেট ও ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। এতে পুলিশের তিন সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন এবং বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড বসানোর পর দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সাইনবোর্ডে লেখা ‘আকবরনগর বাজার। উল্টো পথে আর নয়, নিয়মনীতির হবে জয়।’ এই সাইনবোর্ডে কেন শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হলো তা নিয়ে ২৭ জুলাই দুই গ্রামের মানুষের সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হন। সেদিন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল এবং ৪০টি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, মানুষের দুর্ভোগের চেয়ে ক্ষমতার দাপট ও বংশগত পরিচয় বড় করে দেখাই এসব সংঘর্ষের মূল কারণ। তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে এসে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, প্রতিটি ঘটনার পর মামলা হলেও তদন্ত ও বিচারের গতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। পাঁচটি মামলায় মোট ১০৬ জনকে এজাহারভুক্ত এবং সাড়ে তিন হাজারের বেশি অজ্ঞাতনামা আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এসব ঘটনার মীমাংসা বা সামাজিক সমঝোতাই প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায়।

















