রাতে ফোন চার্জে দেওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ির গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়—এই রেঞ্জ অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আমাদের ফোন, ল্যাপটপ কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে দীর্ঘ সময় ধরে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও, এখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে চলছে নতুন ধারার ব্যাটারি তৈরির নিরন্তর পরীক্ষা। এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য এমন ব্যাটারি তৈরি করা, যা মাত্র কয়েক মিনিটেই পূর্ণ চার্জ হবে, দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বছরের পর বছর ব্যবহারের পরও ক্ষমতা ধরে রাখবে।
এই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সলিড-স্টেট ব্যাটারি। বর্তমানের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে চার্জ পরিবহনের জন্য তরল পদার্থ ব্যবহার করা হয়, তবে সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে সেই জায়গায় সিরামিক, কাচ বা বিশেষ পলিমারের মতো কঠিন পদার্থ ব্যবহৃত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাটারির এনার্জি ডেনসিটি বা শক্তি ধারণের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্ষমতা প্রতি কেজিতে ৩০০ ওয়াট-ঘণ্টা হলেও, সলিড-স্টেট ব্যাটারি ৩৫০ থেকে ৫০০ ওয়াট-ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম। একই ওজনের ব্যাটারি বেশি শক্তি ধরে রাখতে পারলে তা বৈদ্যুতিক গাড়ির অতিক্রান্ত দূরত্ব বাড়িয়ে দেবে এবং ফোনের চার্জ বেশিক্ষণ স্থায়ী করবে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি বেশ সুবিধাজনক। বর্তমান ব্যাটারির তরল উপাদান দাহ্য হওয়ায় আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে, যা কঠিন পদার্থ ব্যবহারে অনেক কমে যাবে। এছাড়া সলিড-স্টেট ব্যাটারির ক্ষয় হওয়ার হারও অনেক কম; কিছু হিসাব অনুযায়ী, কয়েক দশক ব্যবহারের পরও এগুলো মূল ক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ বজায় রাখতে পারে। ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হবে দ্রুত চার্জিং সুবিধা। লিথিয়াম-মেটাল অ্যানোডের মতো উন্নত উপাদান ব্যবহারের ফলে ফোন পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে ফুল চার্জ দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
গাড়ির ক্ষেত্রে টয়োটা ২০২৭ সালের মধ্যে এমন ব্যাটারি আনার পরিকল্পনা করছে, যা একবার চার্জে ১ হাজার কিলোমিটার চলতে পারবে এবং মাত্র ১০ মিনিটে পুরোপুরি চার্জ হবে। স্যামসাংও এমন ব্যাটারি প্রদর্শন করেছে যা ৯ মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ নিতে সক্ষম। তবে এই প্রযুক্তির মূল চ্যালেঞ্জ হলো কঠিন পদার্থের পৃষ্ঠের অমসৃণতা, যার ফলে দুই অংশের মাঝে ক্ষুদ্র ফাঁক থেকে যায় এবং শক্তি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। বিজ্ঞানীরা এখন এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।
এর পাশাপাশি ব্যাটারির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বিএমএস বা ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন নিয়ে কাজ চলছে। প্যানাসনিক এমন ব্যাটারি তৈরি করেছে যা তিন মিনিটে ১০ থেকে ৮০ শতাংশ চার্জ হতে পারে। এছাড়া সিলিকন ব্যবহার এবং সূর্যমুখীর বীজের খোসার মতো জৈব বর্জ্য দিয়ে ব্যাটারি তৈরির পরীক্ষাও চলছে। অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নীতি ব্যবহার করে ‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’র পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে তারবিহীন চার্জিংয়ের সম্ভাবনা জাগাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তি প্রথম বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক গাড়িতে দেখা যাবে। এই বিপ্লব শুধু ব্যাটারির নয়, বরং আমাদের যাতায়াত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাসকেও চিরতরে বদলে দিতে পারে।

















