আরাফাত মিনহাসের অবিশ্বাস্য অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডকে ৮৭ রানে হারিয়েছে পাকিস্তান। রাওয়ালপিন্ডিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে এটি স্বাগতিকদের টানা দ্বিতীয় জয়। প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান ৯ উইকেটে ৩০২ রান সংগ্রহ করে। দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করা হাসান নেওয়াজের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ার পথে মিনহাস ৫৮ বলে ৫৯ রান করেন। পরে বল হাতে ইংল্যান্ডের সাতটি উইকেট পতনে ভূমিকা রাখেন তিনি। ১১.২ ওভার বাকি থাকতেই ২১৫ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম অর্ধশতক করার পর মিনহাস ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন। ৪০ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন এই বাঁহাতি স্পিনার। ওয়ানডে ক্রিকেটে অর্ধশতক ও পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়া তৃতীয় পাকিস্তানি ক্রিকেটার হলেন তিনি। ম্যাচের শেষ দৃশ্যে গাস অ্যাটকিনসনকে রানআউট করে নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পূর্ণতা দেন মিনহাস।
এই জয় ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ও প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। এই ম্যাচের আগে সর্বশেষ নয় ম্যাচের ছয়টিতে জিতেছিল ইংল্যান্ড। শিশিরের প্রভাব দ্বিতীয় ইনিংসে কাজে লাগবে ভেবে টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ব্রুক। কিন্তু মিনহাসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তার সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
একসময় ১৯তম ওভারে ৮১ রানে চার উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু পঞ্চম উইকেটে মিনহাস ও নেওয়াজের ৭৮ রানের জুটি দলকে লড়াইয়ে ফেরায়। এরপর ফাহিম আশরাফের সঙ্গে মাত্র ৪৯ বলে ৭২ রান যোগ করেন মিনহাস। এ সময় বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করে ইংল্যান্ডের ফিল্ডাররা। ২৮ রানে নেওয়াজকে জীবন দেন অ্যাটকিনসন, যখন উইল জ্যাকসের বলে সহজ ক্যাচটি নিতে পারেননি তিনি। মিনহাসও তিনবার বেঁচে যান, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটি আসে তার ১২ রানের সময়।
কুঁচকির চোট কাটিয়ে দলে ফেরা স্যাম কারান নিচু ক্যাচ নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। উইকেটরক্ষক জর্ডান কক্স বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে এক হাতে বল ধরতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত সনি বেকারের বলে আউট হন মিনহাস। ৬৫ রানে তিন উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের সফলতম বোলার ছিলেন বেকার।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য পাকিস্তানের অবস্থা ছিল ভিন্ন। প্রথম বলেই ফখর জামানকে জো রুটের হাতে মিডউইকেটে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন অ্যাটকিনসন। এরপর বেকারের শর্ট বলে আউট হন সাইম আইয়ুব, স্যাম কারান ক্যাচটি নেন। জ্যাকসের অফ স্পিন সামলাতে বেশ সমস্যায় পড়েন বাবর আজম। একাধিকবার ব্যাটের বাইরের প্রান্তে পরাস্ত হলেও অন্য প্রান্তে রান তুলে ৩৪ পর্যন্ত পৌঁছান তিনি। পরে ব্যাট ও প্যাডের মাঝখানের ফাঁক গলে বল স্টাম্পে আঘাত করলে বিদায় নিতে হয় তাকে। শ্রীলংকার বিপক্ষে আগের ম্যাচে ১০৭ রান করা সালমান আগা এবার থেমে যান মাত্র ১৬ রানে। আদিল রশিদের নিচু ফুলটস সুইপ করতে গিয়ে অ্যাটকিনসনের হাতে ক্যাচ দেন তিনি।
এরপর ক্রিজে এসেই রশিদের বলে ছক্কা হাঁকান নেওয়াজ। ৭৪ বলের ইনিংসে চারটি ছক্কা মেরে পাকিস্তানের পাঁচ ছক্কার মধ্যে চারটিই নিজের নামে করেন তিনি। সাইদ বেগের সঙ্গে ৫২ রানের জুটিতে দলকে স্থিতিশীলতা দেন এই ব্যাটার। ১৯ বছর বয়সী বেগ ৩২তম ওভারে অ্যাটকিনসনের বলে আউট হলেও থামেননি নেওয়াজ। সপ্তম চারে অর্ধশতক পূর্ণ করেন মাত্র ৪৬ বলে। পরে জেমি ওভারটনের দুর্দান্ত ইয়র্কারে বোল্ড হন তিনি। নেওয়াজের বিদায়ের পর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন আশরাফ। জ্যাকস ও রশিদের বলে পরপর দুটি বাউন্ডারি মারেন তিনি। শেষ পর্যন্ত হারিস রউফের ইনিংসের শেষ বলের বাউন্ডারিতে ৩০০ রানের গণ্ডি পেরিয়ে যায় পাকিস্তান।
৩০৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভালো শুরু পেয়েছিল ইংল্যান্ড। নতুন বলের চ্যালেঞ্জ সামলে ১৫ ওভারের মধ্যেই ৯১ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন বেন ডাকেট ও টম ব্যান্টন। শাহিন আফ্রিদির বলে কয়েকবার ব্যাটে-বলে সংযোগ করতে ব্যর্থ হলেও নাসিম শাহর এক ওভারেই ১৮ রান তুলে নেন ব্যান্টন। দুটি ছক্কাসহ দ্রুত রান তুলে ইংল্যান্ডকে জয়ের স্বপ্ন দেখান তিনি। তবে রউফের শর্ট বলে আউট হন ডাকেট। ৮৬ রান করা এই ওপেনারের বিদায়ের পর ৫৭ রানে থামেন ব্যান্টন। মিনহাসের শর্ট বলে মিডউইকেটে ক্যাচ দেন তিনি।
এরপর ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ব্রুককে বোল্ড করে নিজের দ্বিতীয় উইকেট তুলে নেন মিনহাস। অফ স্টাম্পের দিকে পিচ করে বলটি তীব্রভাবে ভেতরে ঢুকে ব্রুকের ব্যাটের ফাঁক গলে স্টাম্পে আঘাত করে। মিনহাস ও সাইম আইয়ুবের বোলিংয়ে ইংল্যান্ডের রান তোলার গতি কমে যায়। ৪৮ বল পর বাউন্ডারির দেখা পান কারান। তবে রুট ও কারান ক্রিজে থাকায় তখনো জয়ের আশা বেঁচে ছিল ইংল্যান্ডের। কিন্তু নাসিম শাহর বলে বোল্ড হন রুট। এরপর রউফের বলে ডিপ স্কয়ারে ক্যাচ দেন কারান। ফলে শেষ ১১১ বলে ১২৭ রান করার কঠিন সমীকরণে পড়ে ইংল্যান্ড।
জ্যাকস ও কক্সের কয়েকটি ছক্কা ছাড়া আর তেমন প্রতিরোধ গড়তে পারেনি তারা। এরপর মাত্র ছয় বলের মধ্যে আরও দুটি উইকেট তুলে নেন মিনহাস। কক্স এলবিডব্লিউ হওয়ার পর লং-অনে ক্যাচ দেন ওভারটন। এরপর জ্যাকসকে মিডউইকেটে আফ্রিদির হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন মিনহাস। এটি ছিল এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার দ্বিতীয়বার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি। পরের বলেই এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যান আদিল রশিদ। হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি মিনহাস। তবে বেকার ও অ্যাটকিনসনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে সরাসরি থ্রোতে অ্যাটকিনসনকে রানআউট করে ম্যাচের ইতি টানেন তিনি।
ব্যাটে-বলে এমন অসাধারণ পারফরম্যান্সে পাকিস্তানের জয়ের নায়ক হয়ে উঠেছেন মিনহাস। তার এই নৈপুণ্য শুধু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয়ই এনে দেয়নি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানের নতুন এক অলরাউন্ডারকে নিয়েও প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

















