সমুদ্রের ঢেউ দুপুরে বালুর ওপর একটি তারামাছ রেখে যায়। সূর্যের আলোয় বালুকণাগুলো যখন জ্বলছে এবং দিগন্তের দিকে ফেনার রেখা এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ক্ষুদ্র নীরব বস্তুটিকে তুচ্ছ মনে হতে পারে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম রহস্য প্রায়শই এমন তুচ্ছ বস্তুর মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। একজন সাধারণ দর্শক হয়তো একে উপেক্ষা করবেন, কিন্তু যে চোখ অর্থের সন্ধানে ব্যস্ত, তার কাছে এই প্রাণীটি প্রকৃতির বিশৃঙ্খলার মাঝে এক জ্যামিতিক শৃঙ্খলা ও বহুকে এক করার প্রতীক হয়ে ওঠে। তারামাছের প্রতিটি বাহু যেন এক একটি সম্ভাব্য পৃথিবী বা পথ, যা কোনো নির্দিষ্ট উত্তরের দিকে নির্দেশ না করে বরং অজানা গন্তব্যকেই সত্য বলে ঘোষণা করে।
গত ত্রিশ বছর ধরে অক্টাভিও পাসের রচনাগুলো আমার কাছে অনেকটা সেই তারামাছের মতোই। তার কবিতায় আমি মানুষের অস্তিত্বের সেই চিরন্তন প্রশ্নটি খুঁজে পাই, যার কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই, হয়তো প্রশ্নটিই এখানে উত্তরের বিশুদ্ধ রূপ। পাস কেবল শব্দের কারিগর নন, তিনি সত্তার অনুসন্ধানী। ভ্যালেরি বা টি. এস. এলিয়টের মতোই তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা ও চিন্তা পরস্পরের শত্রু নয়। পাসের রচনায় বিজ্ঞান, রাজনীতি, পুরাণ ও ইতিহাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়; আধুনিক যুগের জ্ঞানকে বিভিন্ন খোপে ভাগ করার প্রবণতাকে তিনি অস্বীকার করেছেন।
ক্লদ লেভি-স্ট্রসের কাঠামোবাদ থেকে মার্সেল দুশাঁর শিল্পকর্ম, কিংবা কোনারকের ভাস্কর্য থেকে ফার্নান্দো পেসোয়া—সবই তার অনুসন্ধানের একই মহাদেশের অংশ। তিনি কোনো সহজ সাদৃশ্য খোঁজার চেয়ে বরং অদৃশ্য ছন্দ খুঁজেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন বাস্তবতাগুলোকে একই গোপন সংগীতে বেঁধে ফেলে। তার চিন্তাকে অনেকটা ‘প্রাক্-সক্রেটিসীয়’ বলা যায়, কারণ তিনি ইতিহাসের গতির চেয়ে সত্তার স্বরূপ—মানুষ কী বা কবিতা কীভাবে অর্থের বাইরে ইঙ্গিত করে—তা নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
মেক্সিকো তার কাছে কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি নিয়তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, অতীতকে মুছে ফেলে ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়, বরং মৃতদের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমেই সভ্যতা এগিয়ে চলে। মালার্মের মতো তিনিও পুরোনো শব্দকে নতুন করে উচ্চারণ করে তার ভেতরকার সুপ্ত অর্থ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তিনি কখনোই আপস করেননি, যা তার নন্দনতাত্ত্বিক চিন্তাকে আরও ঋদ্ধ করেছে।
পাসের ‘সান স্টোন’ আমার কাছে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বিস্ময়কর প্রেমের কবিতা, যেখানে প্রেম মানুষের সীমা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা হয়ে ধরা দেয়। আধুনিক যুগে আমরা যখন কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাই, তখন এই কবিতা বা কোনো ক্ষুদ্র শব্দই আমাদের আবার সেই কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে। তারামাছ যেমন তার পাঁচটি বাহু থাকা সত্ত্বেও একটি কেন্দ্রে স্থিত, অক্টাভিও পাস সেই প্রত্যাবর্তনের শিল্প জানতেন। মানচিত্র পুরোনো হয়ে যায়, কম্পাসের কাঁটা ঘোরে, কিন্তু সেই কেন্দ্র—যদি সত্যিই কোনো কেন্দ্র থাকে—আমাদের অপেক্ষায়ই থেকে যায়।

















