প্রায় ২৮০০ বছর আগে হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘দ্য ওডিসি’ রচনার সময় থেকে গল্পের মৌলিক কাঠামো খুব একটা বদলায়নি। মানুষ পরিচিত জগৎ ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দেয় এবং পরিবর্তিত হয়ে ফিরে আসে—এই চিরন্তন নকশা আজও বিদ্যমান। ব্লেক স্নাইডারের ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘সেভ দ্য ক্যাট!’ বা ড্যান হারমনের ‘স্টোরি সার্কেল’—সব ক্ষেত্রেই গল্পের এই একই রূপ দেখা যায়। পরিবর্তনের বড় জায়গাটি হলো গল্পের উপস্থাপনায় বা পোশাকে। হোমারের নায়ক ওডিসিউস পৃথিবী ভ্রমণের মাধ্যমে নিজের পরিচয় খুঁজেছেন, অন্যদিকে রুমির ‘মসনবি’-তে বাঁশির সুর বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে নিজের অর্থ খুঁজে নেয়। একটির যাত্রা ভৌগোলিক, অন্যটির চেতনার; কিন্তু উভয়ই ‘ঘর’ বা অস্তিত্বের সন্ধানে চালিত।
গল্প কেবল ঘটনার সমষ্টি নয়, এটি মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধন। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পোয়েটিক্স’-এ কাহিনি, চরিত্র ও ক্যাথারসিসের মাধ্যমে গল্পের শরীর বিশ্লেষণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্যাম্পবেলের পুরাণের নকশা অনুসরণ করে লুকাস ‘স্টার ওয়ার্স’-এ প্রযুক্তির সংমিশ্রণে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। তলোয়ার বদলে গেল লাইটসেবারে, রাজ্য বদলে গেল গ্যালাক্সিতে। নায়ক বদলালেন না। এরপর গল্প আরও পদ্ধতিগত হলো। সিড ফিল্ড তিন অঙ্কে, স্নাইডার ১৫টি বিটে, হারমন আটটি ধাপে গল্পকে বিন্যস্ত করলেন। রবার্ট ম্যাকি গল্পকে দেখলেন শৃঙ্খলিত কারুশিল্প হিসেবে। রহস্য তখন পদ্ধতিতে পরিণত হলো। কিন্তু রহস্য হারিয়ে গেল না। শুধু তাকে মাপার উপায় তৈরি হলো। তবে হলিউড এবং বিজ্ঞাপন শিল্পের হাত ধরে গল্প এখন একটি পণ্য ও বাস্তবতা সংগঠনের অন্যতম পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।
ইন্টারনেটের যুগে গল্পের বড় শত্রু এখন আর বিস্মৃতি নয়, বরং তথ্যের প্রাচুর্য। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স বা টিকটকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা অ্যালগরিদম দ্বারা শাসিত। এখানে গল্পকার ও মেশিনের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মানুষ গল্প লেখে ঠিকই, কিন্তু কোন গল্প পাঠককে ধরে রাখবে তা নির্ধারণ করে অ্যালগরিদম, যা আবার নতুন গল্পের ধরনকে প্রভাবিত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। এআই এখন একই গল্পের অগণিত সংস্করণ তৈরি করতে সক্ষম।
বর্তমান সময়ে প্রশ্নটি কেবল ‘এআই কি গল্প লিখতে পারে?’ তা নয়, বরং অসীম উৎপাদনের ভিড়ে কোন গল্পটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে—এটিই মুখ্য। এআই একই পৃথিবীর জন্য হাজারো ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করতে পারে, যা আমাদের যৌথ বাস্তবতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আজকের সাইক্লপস হয়তো অ্যালগরিদম, আর সাইরেন হলো নোটিফিকেশন। প্রাচীন নায়কেরা যাত্রা শেষে ফিরে আসতেন, কিন্তু আধুনিক মানুষ ক্রমাগত পরিবর্তনশীল পেশা ও প্রযুক্তির স্রোতে এক অসমাপ্ত গল্পের অংশ হয়ে বেঁচে থাকে। গল্পের ভবিষ্যৎ তাই এখন আর কোনো একক কাহিনি নয়, বরং অসংখ্য সম্ভাবনার এক গোলকধাঁধা, যেখানে মানুষ আজও সেই আদি প্রশ্নটিই খুঁজছে—আমি কে এবং আমার ঘর কোথায়?

















