সামাজিক রীতিনীতি কেমন হবে এবং একে অপরকে কীভাবে অভিবাদন জানাতে হবে, ইসলাম তার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ‘আসসালামু আলাইকুম’—যার অর্থ ‘আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক’—এটি ইসলামের এক চমৎকার অভিবাদন পদ্ধতি। সালামের আভিধানিক অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। শরিয়তের পরিভাষায়, একজন মুসলিম যখন অন্য মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন, তখন যে বাক্যের মাধ্যমে একে অপরের কল্যাণ, দোয়া, বন্ধুত্ব ও নিরাপত্তা কামনা করেন, তাকেই সালাম বলা হয়। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি হৃদয়ে ভালোবাসার বীজ বপন করার এক কার্যকর মাধ্যম।
সালামের এই নান্দনিক বিধানটি স্বয়ং মহান আল্লাহ প্রবর্তন করেছেন। বোখারি শরিফের হাদিস (৩৩২৬) অনুযায়ী, মহানবী (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহতায়ালা আদম (আ.)-কে ষাট হাত উচ্চতায় সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের দলকে সালাম দিতে বললেন। আদম (আ.) সেখানে গিয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভিবাদন জানান। উত্তরে ফেরেশতারা ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে উত্তর দেন, যেখানে তাঁরা ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ অংশটি যুক্ত করেছিলেন। এই পদ্ধতিই আদম (আ.) ও তাঁর সন্তানদের জন্য অভিবাদনের রীতি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা সালামের জবাব আরও উত্তমভাবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন কেউ সালাম দেয়, তখন যেন তাকে তার চেয়ে উত্তম ভাষায় অথবা অন্তত একই ভাষায় উত্তর দেওয়া হয়। সালাম প্রদানকারী ব্যক্তি অহংকার থেকে মুক্ত থাকেন এবং বিনয়ী হন, যা আল্লাহর রহমত লাভের উপায়। অন্যদিকে, অহংকার শত্রুতা সৃষ্টি করে। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত অহংকার পরিহার করে সালামের প্রসারে প্রতিযোগিতা করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইসলামের কোন কাজগুলো উত্তম? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, অন্যকে খাদ্য খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া (বোখারি: ১২)। সালামের মাধ্যমে শত্রুতা ও পরশ্রীকাতরতা দূর হয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়। তিরমিজি শরিফের হাদিস (২৬৮৮) অনুযায়ী, রাসুল (সা.) বলেছেন, ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর পরস্পরকে না ভালোবাসা পর্যন্ত কেউ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। তিনি পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে সালামের ব্যাপক প্রসারের পরামর্শ দিয়েছেন।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে বেশি বেশি সালাম বিনিময় করা। এটি আমাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত ও কল্যাণকর করে তোলে। শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, বরং আমাদের সন্তানদেরও এই অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তাদের ছোটবেলা থেকেই সালাম আদান-প্রদান শেখাতে হবে। সালামের ব্যাপক প্রচার-প্রসারের মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

















