বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও গতিপথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর ৩০ জুলাই ঢাকায় আসছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান যুক্ততা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, তিন দিনের সফরের প্রথম দিনে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে এবং সফরের শেষ দিনে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সার্জিও গরের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, কৌশলগত অবস্থান এবং ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা। বিশেষ করে জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, একই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, ওয়াশিংটন তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করতে চায়। এই জানা-বোঝার ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের আগস্টে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছেন, তার আলোকে আগামী ২ বছরে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সার্জিও গর। নয়াদিল্লিকে কেন্দ্র করে তিনি বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে গত মার্চে তিনি শ্রীলঙ্কা এবং এপ্রিল-মে মাসে নেপাল সফর করেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের আঞ্চলিক কৌশলেরই অংশ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিআইপিএসএস-এর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে সার্জিও গরের এই প্রথম বাংলাদেশ সফর বেশ গুরুত্ববহ। তিনি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ বুঝতে চাইবেন, বিশেষ করে চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের সমীকরণটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সার্জিও গরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্কের সমীকরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তি বা এআরটির কার্যকারিতা, যেখানে বাজারভিত্তিক নয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তাবলি জড়িত। তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে অস্বস্তি রয়ে গেছে, তা নিরসনে সরকারের পরিকল্পনা কী, তা-ও জানতে চাইতে পারে ওয়াশিংটন। এর আগে মার্চে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ বাংলাদেশ সফর করেছিলেন, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়।

















