বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দেশটি কি অতীত থেকে বেরিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও অস্থিরতার চক্রে আটকে থাকবে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী মত, গণমাধ্যমকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর যে নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তা এখনো জনমনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমান এবং তার সমর্থকগোষ্ঠীর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গত ২৮ অক্টোবর এক আলোচনায় সরকারের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি এই সরকারকে দায়মুক্তি দিয়ে দিই, তাহলে আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে পারে।’ নাহিদ ইসলামের দাবি অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় অন্তত ১ জন করে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা এবং অন্তত ৪০০ জন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এখন সময়ের দাবি। তিনি অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগ এখনো ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কোনো কার্যকর সংস্কার হয়নি। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, বিএনপিপন্থি ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য ও মাফিয়া রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলো বাংলাদেশে এখনো বিদ্যমান, যা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
তারেক রহমানের জন্য পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করাও সমান চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা বর্তমান সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। সরকার আঞ্চলিক সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চাইলেও হাসিনার শাসনামলের ভারতপন্থি উত্তরাধিকার এবং আমলাতন্ত্রের গভীরে প্রোথিত মানসিকতা এই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে, তবে স্থলসীমান্ত ও নদীকেন্দ্রিক নির্ভরশীলতার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো ঢাকার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে সরকার কোনো আঞ্চলিক শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করে অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধান এবং হাসিনা আমলের নৃশংসতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায়। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক বিষাক্ততা কমিয়ে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্বের সমন্বয় ঘটানোই এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।

















