বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন দায়িত্ব পালনকালীন নিজের অভিজ্ঞতা ও সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা থেকেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যদিও দেড় বছরের অভিজ্ঞতা সব সময় সুখকর ছিল না। তার ভাষ্যমতে, সরকার গঠনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা।
তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মপদ্ধতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ড. ইউনূস অনুভব করতেন। তবে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উষ্ণ সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি ড. ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপের উদ্যোগও তাদেরই নিতে হয়েছিল। ২০২৪–এর ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তিনি জানান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি অবহিত ছিলেন না, যা তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। বিশেষ করে লুৎফে সিদ্দিকীকে আন্তর্জাতিক বিষয়-সংক্রান্ত বিশেষ দূত নিয়োগের বিষয়টি তিনি সরকারি নির্দেশ জারির পর জানতে পারেন।
সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন জানান, তিনি বিভিন্ন সময়ে তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এর একটি কারণ ছিল একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সক্রিয়তা, যারা তার অজান্তেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। ২০২৪–এর নভেম্বর–ডিসেম্বরের দিকে এমন একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন, স্যার, এটা ঠিক হবে না। জেনেভার বিমানবন্দরে আসিফ নজরুলকে ঘিরে ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং পরবর্তীতে ২০২৫–এর ২২ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিয়ে ঘটা ঘটনার পর তিনি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব চালিয়ে যান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিষয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। এছাড়া সরকারের শেষ দিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারের বাইরে চলে গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তৌহিদ হোসেন বলেন, দায়িত্ব ছাড়ার তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তি না করাই যথাযথ ছিল। সবশেষে তিনি স্বীকার করেন যে, শেষ পর্যায়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার অনেক বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ চলে আসায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারাচ্ছিল।

















